হঠাৎ জ্বর, পাতলা পায়খানা, শরীরে গুটি বসন্তের মতো দাগ। দফায় দফায় ওষুধ খাইয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আনা হয়েছে তিন মাস ১২ দিন বয়সী রাফাতকে। শিশুটি হামে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। অথচ যার হাম প্রতিরোধী টিকা (এমআর১) নেওয়ার বয়সই এখনো হয়নি।
শয্যা না পাওয়ায় হাসপাতালটির চতুর্থ তলায় মেঝেতেই দুদিন ধরে চিকিৎসা চলছে রাফাতের।
শিশুটির মা ফাতেমা আক্তার ভাষ্য, ‘প্রায় সাড়ে তিন মাস বয়স ওর (রাফাত)। এই বয়সে বুকের দুধ ছাড়া আর কিছু খাওয়ানো তো যায় না। কয়েক দফা অসুস্থ হয়েছিল। প্রায় সময় জ্বর আসে। শরীরে লাল দাগ উঠলে এখানে নিয়ে আসি। ডাক্তার দেখেই বলেছে হাম। এখন টিকার বয়সই তো হয় নাই, তবুও আক্রান্ত হয়েছে। এখন কী করব।’
একই তলায় মেঝেতেই হ্যাতে স্যালাইন চলছে শাফায়েতের। সাত মাস বয়সী এই শিশুও তিন দিন ধরে হামের উপসর্গ নিয়ে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সে শ্বাসকষ্টেও ভুগছে।
শাফায়েতের মা দিলারা বলেন, ‘মিরপুরে থাকি। প্রায় চার দিন ধরে জ্বর আর শ্বাসকষ্ট। ডাক্তার দেখালেও উন্নতি না হওয়ায় শ্যামলীর শিশু হাসপাতালে নিলে সেখান থেকে গত সোমবার এ হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার বুকের দুধ খাওয়াতে নিষেধ করেছে, স্যালাইনই নাকি এখন তার খাবার। প্রায় সময় শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অক্সিজেন দিতে হয়। কিন্তু ঠিকমতো সেটা পাওয়া যায় না। নার্সদের লাগাতে বললেও রাগ হয়।’
শুধু এ দুটি শিশুই নয়, সংক্রামক রোগের এই বিশেষায়িত হাসপাতালে হামে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের প্রায় ৭০ ভাগের বয়স ৯ মাসের কম। যাদের এত দিন টিকা নেওয়ার সুযোগই ছিল না।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে বুধবার (১৩ মে) বেলা ১১টা পর্যন্ত ১ হাজার ৪৮ জনকে শিশুকে হামজনিত জটিলতা নিয়ে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৪৫ জন। যার মধ্যে ৭ জন নিশ্চিত হামে, বাকিরা সন্দেহভাজন হিসেবে।
বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভর্তি ছিল ৫৯ জন। এর মধ্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ছিল ১২ জন।
দুই সংস্থার গবেষণা শুরু
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের এ হাসপাতালে যেসব শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে আসছে, এর মধ্যে ৭০ ভাগেরই টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। তারপরও আক্রান্ত হওয়ার মূল কারণ হতে পারে মায়েদের অপুষ্টি। গর্ভাবস্থায় মায়েদের যে ধরনের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার কথা, তার রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা বৃদ্ধি হওয়ার কথা, সেটি না হওয়ায় মূলত এমনটা হচ্ছে। এটি ইতোমধ্যে দুটি সংস্থা গবেষণা শুরু করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘টিকাদান শুরুর পর রোগীর চাপ এ হাসপাতালে কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে। গত মাসে যেখানে বহির্বিভাগে গড়ে ৩০ জনের মতো আসত, বর্তমানে সেটি কমে অর্ধেকের কাছাকাছি এসেছে। আবার ভর্তি রোগী যেখানে ছিল ৮০ জনের মতো, বর্তমানে ৬০ থেকে ৬৫ জনে নেমে এসেছে। চলমান ক্যাম্পেইনে টিকার কার্যকারিতা শুরু হলে হয়তো আরও কমবে। এটি দিয়ে হয়তো সংক্রমণ ঠেকানো যাবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের সুরক্ষা দিতে গেলে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।’
হামের প্রকোপ শুরু হলে গত ৫ এপ্রিল দেশের ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এত দিন ৯ মাস বয়স হলে হাম প্রতিরোধী টিকা নেওয়া যেত। কিন্তু তার আগেই আক্রান্ত হওয়ায় কর্মসূচি শুরুর আগে সরকারের ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপ (নাইট্যাগ) ছয় মাস বয়সেই টিকা দেওয়ার সুপারিশ করে। সে অনুযায়ী ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী দেশের প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে চলছে ক্যাম্পেইন। যা আগামী ২০ মে পর্যন্ত চলবে বলে জানিয়েছে সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাম ও হাম সন্দেহে ১ হাজার ৬১৫ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এ সময় মারা গেছে ৮টি শিশু। সব মিলিয়ে রোগী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ২০৬ জন। আর মৃতের সংখ্যা বেড়ে ঠেকেছে ৪৩২-এ।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এমন পরিস্থিতিতে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এতে হামের সর্বশেষ অবস্থা ও সরকারে নানা পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার।
একজন পুষ্টিবিদ জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘অতীতের অব্যবস্থাপনা এবং ২০২০ সালের পর হামবিরোধী ক্যাম্পেইন না হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আগের সরকার (আওয়ামী লীগ) টিকাদান কভারেজের তথ্য বিকৃত করায় অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে।’
বিশেষ সহকারী আরও বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ মা ও শিশুদের অপুষ্টি। আমরা দেখছি আক্রান্ত বড় একটি অংশ টিকা গ্রহণের বয়সের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক শিশু ছয় মাসের কম বয়সী। এটির পেছনে মায়েদের অপুষ্টি বড় দায়ী। কিন্তু পুষ্টির বিষয়টিতেই আমরা গুরুত্ব কম দিচ্ছি বলে মনে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কোভিড মহামারিতে হামের বিষয়ে সতর্ক করা হলেও সে সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এরপর টিকা কাভারেজের তথ্যও বিকৃত করা হয়েছে। বর্তমান সরকারই সবচেয়ে কম সময়ে টিকার ব্যবস্থা করতে পেরেছে। ক্যাম্পেইন শুরুর পর থেকে ইতোমধ্যে কাভারেজের হার শতভাগের কাছাকাছি পৌঁছেছে। পরিস্থিতি উন্নতি হতে শুরু করেছে। তবে পুরোপুরি সুফল পেতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, টিকা গ্রহণের ১ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে।’
এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ। প্রথম ধাপে অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোয় হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণের পর শরীরে রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত তিন সপ্তাহ সময় লাগে। তাই শিগগিরই দেশে হামের সংক্রমণ কমে আসবে।’
যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি, এমনকি নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমের আওতায় দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুরাও যেন ক্যাম্পেইনের আওতায় হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ করে, অভিভাবকদের সেই আহ্বান জানান তিনি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘হাম প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, ভিটামিন ‘এ-এর অভাবে অন্ধত্ব এবং বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব শিশুর মায়ের বুকের দুধের ওপর নির্ভরশীল, তাদের রোগ রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম। এ জন্য শিশুর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত জ্বর, খেতে না পারা কিংবা তীব্র ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।’
