Image description

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা না করা নিয়ে বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দল। ইতোমধ্যে রাজপথে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তারা। আগামী ১৬ মে রাজশাহীতে মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে হার্ডলাইনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন নেতারা।

অপরদিকে সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে—এটি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। এ নিয়ে তিনি সংসদের ভেতরে ও বাইরে একাধিকবার কথা বলেছেন। তার মতে, আলোচনার ভিত্তিতে এটি সংসদেই সমাধান করা যায়।

সর্বশেষ মঙ্গলবার (১২ মে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘রাজনীতি সংসদে হওয়া উচিত, রাজপথে হইচই করে কিছু গড়া যায় না।’’

সরকারপ্রধানের এমন মনোভাবের পরও কেন বারবার এটি নিয়ে কথা বলছে বিরোধী দলগুলো। কেন এমনটি হচ্ছে? তারা কি তার প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রাখতে পারছে না? আসলে তারা কি চায়? এ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জানতে চাইলে ১১ দলীয় জোটের শরিক আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের কথা মুখে মুখে বললেও কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না।’’

তিনি বলেন, ‘‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১৬ মে থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠেয় সমাবেশ হবে ধাপে ধাপে কর্মসূচির অংশ। এর মাধ্যমে আমরা সারা দেশের জনগণকে সজাগ, সচেতন ও সম্পৃক্ত করবো। যারা গণভোটে অংশ নিয়েছেন এবং বিশেষ করে ‘হ‍্যাঁ’র পক্ষে ভোট দিয়েছেন— আমরা সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই। জনগণের কাছে আমাদের বার্তা হলো, গণভোটের রায় না মেনে বিএনপি যে অন‍্যায় করছে, তারা যেন তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। মূলত সরকারকে সঠিক পথে চালিত করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতেই আমাদের এ কর্মসূচি।’’

বিতর্ক শেষ হচ্ছে না

২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক অনুষ্ঠানে জুলাই জাতীয় সনদে সই করেন বিএনপি ও জামায়াতসহ ২৫টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। তবে ‘অভিমান’ করে তখন না করলেও নির্বাচনের পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি যমুনায় গিয়ে সই করেন এনসিপির নেতারা। যদিও নির্বাচনের পর জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধ অব্যাহত আছে।

জামায়াত ও এনসিপির দাবি সংবিধান সংস্কার করতে হবে। রাষ্ট্রপতির সংস্কারাদেশ অনুযায়ী সংস্কার কমিটি গঠন করতে হবে।

কিন্তু বিএনপি চায় সংশোধন। দলটির মতে, বিদ্যমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কারের’ কোনও বিধান নেই। ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ আছে। তাই সনদে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিএনপি এর সবগুলো হুবহু সংবিধানে যুক্ত করতে চায় না। বিশেষ করে সনদের ১৫ ধারায় একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান না হওয়ার কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদের ১৫ নম্বর ধারায়। সংবিধান সংশোধন বিল আইন সভার উভয় কক্ষে পাস হতে হবে—এমন প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে।

বিএনপি এই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নয়। আবার উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে দলটি একমত হলেও এর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে জুলাই সনদে যা বলা হয়েছে, সেখানে দলটির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। কিন্তু উচ্চকক্ষ গঠন করার বিষয়ে বিরোধী নয় বিএনপি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার নানা কথা বললেও তারা সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। এতে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হচ্ছে। একদিকে সরকারপ্রধান সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অপরদিকে সংস্কারের কোনও উদ্যোগ নিচ্ছেন না। তাই দাবি আদায়ে আমরা সংসদ ও রাজপথ দুদিকে চাপে রেখেই দাবি আদায় করবো।’’

যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আড়াই মাসের মাথায় নির্বাচনি ইশতেহারের বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন তারেক রহমান। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মগুরুদের ভাতা প্রদান এবং খাল খননের কাজ সম্পন্ন করেছেন। এর বাইরেও ধাপে ধাপে বিভিন্ন কর্মসূচি নিচ্ছেন।

অপরদিকে জুলাই গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংসদের ভেতরে ও বাইরে কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, জুলাই সনদের প্রতিটি ধারা অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করবেন।

গত ২০ এপ্রিল বগুড়ার জনসভায় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘জুলাই সনদের প্রতিটি দফা ইনশাআল্লাহ বাস্তবায়ন করবো।’’  তিনি বলেন, ‘‘আজ এই হাজারো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে, মিডিয়ার সামনে আমি আবারও পরিষ্কারভাবে বলে দিতে চাই—সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে জুলাই সনদে সই করে এসেছে, সেই জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ আমরা এক এক করে বাস্তবায়ন করবো। বারবার পরিষ্কারভাবে এ কথা বলে দেওয়ার পরও আমরা দেখলাম কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।’’

এর আগে গত ১২ এপ্রিল ঢাকা সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনীর দরবারে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’’

তবু হার্ডলাইনে বিরোধী দল

বর্তমান সরকারের সময় বিভিন্ন ইস্যুতে একাধিক কর্মসূচি পালন করেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। যদিও সেসব কর্মসূচি ছিল নামে মাত্র। তবে এরই মধ্যে তারা বড় ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

আগামী ১৬ মে থেকে রাজশাহীতে মহাসমাবেশের মাধ্যমে তারা কঠোর আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন নেতারা।

গত ৩০ এপ্রিল সংসদের প্রথম অধিবেশনের শেষ দিলেও এ নিয়ে কোনও সুরাহা না হওয়ায় সেদিনই সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন জোট নেতারা।

ঢাকাসহ দেশের সাত বিভাগে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলীয়। এরই মধ্যে ২ মে সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও ১০ মে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১১ দলের সেমিনার করেছে তারা। নতুন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৬ মে রাজশাহীতে, ১৩ জুন চট্টগ্রামে, ২০ জুন খুলনায়, ২৭ জুন ময়মনসিংহে, ১১ জুলাই রংপুরে, ১৮ জুলাই বরিশালে এবং ২৫ জুলাই সিলেটে বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

সেদিন জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান বলেন, ‘‘দাবি আদায়ে তাদের ধারাবাহিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। এ নিয়ে সর্বশেষ অক্টোবরে ঢাকায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।’’

বিরোধী দলে কেন এত অবিশ্বাস?

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পরও জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দলগুলো বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১১ দলীয় জোটভুক্ত একটি দলের এক সিনিয়র নেতা বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চূড়ান্ত কিছু বলছেন না। এছাড়াও সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি সরকারি দলের সদস্যরা। তারা সংবিধান সংশোধনের কথা বলে সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছেন।’’

এ ব্যাপারে অবিশ্বাস দানা বেঁধেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেছেন—জুলাই সনদ হচ্ছে অন্তহীন প্রতারণার দলিল, বলেন এই নেতা।

জানতে চাইলে  ১১ দলের শরিক খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকারপ্রধান সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও মন্ত্রীদের কথাবার্তায় সন্দেহ দেখা দিয়েছে। আমরা মনে করি, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আন্দোলনের বিকল্প নেই।’’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদীয় দলের হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার শপথের দিন থেকেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। রাষ্ট্রপতির সংস্কার আদেশের পরও তারা সংস্কার পরিষদ গঠন করেনি। বরং তারা কথায় কথায় ফ্যাসিবাদী সংবিধানের পক্ষে বয়ান দিচ্ছে। তাই সরকারপ্রধানের কথায় দেশের মানুষ আস্থা পাচ্ছেন না। এ জন্য আমাদের আন্দোলনের বিকল্প নেই।’’