ফুটবলের মহারণ কাউন্ট-ডাউন শুরু হয়েছে দেশে দেশে। চলছে নানা প্রস্তুতিও। টেলিভিশনের পর্দায় খেলা সম্প্রচারে চলছে নানা আয়োজন। কিন্তু টিভি পর্দায় খেলা দেখা নিয়ে দেশের দর্শকদের অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। এশিয়া অঞ্চলে ফিফা’র সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এখন পর্যন্ত আলোচনা চূড়ান্ত করতে পারেনি বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান। বিশ্বকাপের ক্ষণ গণনা শুরু হলেও দেশে সম্প্রচারের বিষয়টি এখনো অনেকটা অন্ধকারে।
আসছে ১১ই জুন তিন আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে পর্দা উঠতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের। এই খেলা সম্প্রচার নিয়ে দেশে দেশে চলছে প্রতিযোগিতা। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান উচ্চমূল্য হাঁকানোয় এবং স্থানীয় সময়ের সঙ্গে সম্প্রচার সময়ের বড় তারতম্য থাকায় অনেক দেশ আবার স্বত্ব্ব কেনা নিয়ে জটিলতায়ও পড়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণেও অনেক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নিতে চাইছে না। বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে জটিলতায় পড়েছে ভারত, চীনের মতো দেশও। গভীর রাতে খেলা হওয়ার কারণে অতিরিক্ত দামে সম্প্রচার স্বত্ব কিনতে চাইছে না দেশ দু’টি। এই জটিলতা না কাটলে বিশ্বকাপ দেখা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ।
ফিফা জানিয়েছে, ইতিমধ্যে বিশ্বের ১৭৫টিরও বেশি অঞ্চলে সম্প্রচার চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভারত ও চীনের বিষয়ে আলোচনা এখনো চলমান। কয়েক মাস আগে জানা গিয়েছিল, ফিফা ভারতকে ১০০ মিলিয়ন ডলার এবং চীনকে ২৫০-৩০০ মিলিয়ন ডলারে বিশ্বকাপের সমপ্রচার স্বত্ব দিতে চেয়েছিল। দুই দেশের কেউ এই দামে সম্প্রচার স্বত্ব নিতে রাজি হয়নি। ভারতে সেই মূল্য নেমে এসেছে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলারে। সবচেয়ে কাছাকাছি প্রস্তাব দিয়েছে জিওস্টার, প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার। বিষয়টি অবাক করার মতো, কারণ ২০১৪ ও ২০১৮ বিশ্বকাপের জন্য সনি ৯০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের জন্য ভায়াকম-১৮ দিয়েছিল ৬২ মিলিয়ন ডলার।
চীনের বিষয়টি ফিফার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০২২ বিশ্বকাপে বৈশ্বিক টিভি দর্শকের ১৭.৭% এসেছিল চীন থেকে, আর ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমে সেই হার ছিল প্রায় ৪৯.৮%। চীনের রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল সিসিটিভি-এর বাজেট ছিল মাত্র ৬০-৮০ মিলিয়ন ডলার, যেখানে ফিফা চাইছিল ২৫০-৩০০ মিলিয়ন ডলার। পরে মূল্য কমিয়ে ১২০-১৫০ মিলিয়ন ডলারে নামানো হলেও তা এর নাগালের বাইরে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি প্রায় একইরকম। গেল কয়েকটি বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল বেসরকারি টিভি চ্যানেল। তারা বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)কে দিলে বিটিভি তা সম্প্রচার করতো। তবে সবশেষ কাতার বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল বিটিভি। বিটিভি’র পাশাপাশি নাগরিক টিভি, টি-স্পোর্টস ভারতের রিলায়েন্স গ্রুপের ভায়াকমের কাছ থেকে সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল। এবার এশিয়ার সম্প্রচার স্বত্ব পেয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্প্রিংবক। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রচার স্বত্বের জন্য প্রায় ১৫১ কোটি টাকা দাবি করেছে। এর সঙ্গে কর (এআইটি) ও ভ্যাট যোগ করলে খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২০০ কোটি টাকায়।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে স্বত্ব কেনা স্থানীয় চ্যানেলগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। টি-স্পোর্টসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও বিশাল এই আর্থিক ব্যবধানের কারণে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। যেমনটা হয়েছে তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতে। দেশ চারটির সরকারি টিভি চ্যানেল এক প্রকার বাধ্য হয়েই বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নিয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ম্যাচের সময়সূচি। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিতব্য এবারের বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৫২টি ম্যাচ শুরু হবে বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টার আগে এবং বাকি ৫২টি ম্যাচ ভোর ৪টার পর। অর্থাৎ সিংহভাগ ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে ভোরের দিকে। সমপ্রচার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোরের দিকে ম্যাচ হওয়ায় দর্শকসংখ্যা কম থাকবে। এতে বিনিয়োগ করে টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের ব্যবসায়িক ঝুঁকি দেখছেন তারা।
বিটিভি সূত্র বলছে, ২০১৮ সালে ‘প্যাকেজ নীতিমালা’ (যারা সমপ্রচার স্বত্ব পেতো, তারা বিটিভি’র মাধ্যমে সমপ্রচার করতো। এর আওতায় কোনো খরচ ছাড়াই বিশ্বকাপ সম্প্রচার করেছিল বিটিভি। তবে ২০২২ সালে এই নীতিমালা বাতিল হয়ে যায়। ফলে ওই বছর বিশ্বকাপের আগে শেষ মুহূর্তে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে অর্থ বরাদ্দ পায় বিটিভি। তখন ‘বিশেষ বাজেটে’ ৯৮ কোটি টাকা খরচ করে সম্প্রচার স্বত্ব কিনেছিল তারা। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সিঙ্গাপুরের স্প্রিংবক বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির জন্য প্রথমে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। মন্ত্রণালয় তাদের প্রস্তাব বিটিভি’র কাছে পাঠায়।
গত এপ্রিলে বিটিভি স্প্রিংবকের কাছে সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য জানতে চায়। তখন স্প্রিংবকের পক্ষ থেকে ১৫০ কোটি টাকা চাওয়া হয়। বিটিভি সূত্রের দাবি, এত বেশি খরচ দেখে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিটিভিকে ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়, যাতে বিনা মূল্যে দেখানোর সুযোগ পাওয়া যায়। বিটিভি যোগাযোগ করলেও ফিফা এই অনুরোধে এখনো সাড়া দেয়নি। এ অবস্থায় করণীয় ঠিক করতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি গতকাল পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
এ নিয়ে গতকাল তথ্য মন্ত্রণালয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা থাকলে তা বাতিল করা হয়।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানা মানবজমিনকে বলেন, ‘আমরা ফিফার কাছে চিঠি দিয়েছি। এর উত্তর এখনো পাইনি। গতকালের সভাটিও বাতিল করা হয়েছে। তাই এ ব্যাপারে নতুন কোনো তথ্য নেই। তবে দ্রুতই আপনারা বিশ্বকাপ সমপ্রচারের বিষয়ে আপডেট জানতে পারবেন।’