Image description
গুম আয়নাঘর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এক-এগারোর সৃষ্টি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, এক-এগারোর সরকারের সময় যেসব অমানবিক ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনা ঘটেছে, এগুলোর নেপথ্যে মূল মহানায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। গত রবিবার ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর এ কথা বলেন। গত বৃহস্পতিবার মাসুদ উদ্দিনকে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখান ট্রাইব্যুনাল-২। একই দিন মাসুদ উদ্দিনকে এক দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করে বলেছেন, তাকে এক-এগারোর মানবতাবিরোধী এবং অমানবিক অপরাধের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দৃশ্যত এটি পরিষ্কার হলো যে, এক-এগারোর ষড়যন্ত্র, সেই শাসনকালে সংঘটিত জুলুম, নির্যাতন, গুম হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজির ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের আওতাভুক্ত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(১) ক ধারায় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা হলো-মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ : যথা, হত্যা, নিশ্চিহ্ন করণ, দাসকরণ, নির্বাসিত করা, কারারুদ্ধ করণ, অপহরণ, অবরোধ, নির্যাতন, ধর্ষণ অথবা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর অন্যান্য অমানবিক কাজ পরিচালনা করা অথবা সংগঠিত হওয়ার স্থানের অভ্যন্তরীণ আইন ভঙ্গ করে বা না করে রাজনৈতিক, গোত্রগত, জাতিগত অথবা ধর্মীয় কারণে অভিশংসন করা।’ এই ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এক-এগারোর সময় সংগঠিত অনেক অবৈধ কর্মকাণ্ড এ ধারার আওতায় পড়েছে। অর্থাৎ ২০০৭ সালের এগারো জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদ এবং মইন উ আহমেদের সরকার যা করেছে তার বেশির ভাগই এই ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধ। যেমন, এক-এগারো সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরই অস্ত্র উদ্ধারের নামে বিভিন্ন জায়গায় ক্রস ফায়ারে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুযায়ী এক-এগারোর সময় ৬৭ জনকে বিচারবহির্ভূত ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম এবং আয়নাঘরের সূচনা এক-এগারোর সময় থেকেই।

এক-এগারোর সময় নিরীহ মানুষকে নির্যাতন, বিনাবিচারে কারা অন্তরিন, নির্বাসিত জীবনে বাধ্য করার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং বেগম জিয়ার জেষ্ঠ্য পুত্র বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বেগম জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ সহস্রাধিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে বিনাবিচারে আটক করা হয়েছিল। বিশেষ করে মাসুদ উদ্দিনের প্রত্যক্ষ নির্দেশে তারেক রহমানের ওপর চালানো হয় বর্বর নির্যাতন। এসবই মানবতাবিরোধী অপরাধ। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, এক-এগারোর যে সরকারটি ছিল, সেখানে মাসুদ উদ্দিন বা আরও কয়েকজনকে ‘ডিফ্যাক্টো গভর্মেন্ট’ (কার্যত সরকার) বলা হতো। পুরো সরকারটাই তাঁরা চালাতেন। সে কারণে তারা (ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন) জিজ্ঞাসাবাদ করে যে তথ্য পেয়েছে, আরও হয়তো তথ্য পাওয়া যাবে। যে কথাগুলো তিনি তাঁদের বলেছেন, সেগুলো তাঁরা যাচাইবাছাই করছেন। যদি প্রয়োজন হয় তাঁকে আবার তাঁরা জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ১/১১-এর সময় ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে কর্নেল (অব.) ইমরান মইনুল রোডের বাসভবন থেকে তাঁকে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করে ডিজিএফআই-এর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। জেনারেল মইন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিনের উপস্থিতিতে আর্মি হেড কোয়ার্টারে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই গ্রেপ্তারের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন এবং সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি। মেজর ইমরানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন রানার ও একজন ড্রাইভার নিয়ে তিনি মইনুল হোসেন রোডস্থ খালেদা জিয়ার বাসভবনে উপস্থিত হন। এ সময় বাসভবনের চারপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া উপস্থিতি ছিল। মেজর ইমরান বাসভবনের মেইন গেট দিয়ে প্রবেশ করে বাড়ির ভিতরে নিজ গাড়িতেই অবস্থান নেন।

আনুমানিক তিন ঘণ্টা পর তারেক রহমান বাসভবন থেকে বের হলে মেজর ইমরান তাঁকে নিয়ে গাড়িতে ওঠেন। নিয়ে যান নির্ধারিত গন্তব্যে। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর মেজর ইমরানের সঙ্গে থাকা রানার তারেক রহমানের মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। এ সময় তারেক রহমান জানালা খোলার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে মেজর ইমরান তা নাকচ করে দেন। এরপর সিটিআইবির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তারেক রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। সিটিআইবির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্নেল জিএস লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তার নির্দেশেই অন্য কর্মকর্তারা বিশ্রী ভাষায় তারেক রহমানকে গালিগালাজ করেন। জেআইসিতেই তারেক রহমানকে তিন-চার দিন রাখা হয়। সেখানে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বেঁধে রাখা হয়। হাত বাঁধা অবস্থায় ঝুলিয়ে রেখে নির্যাতন করা হয়। দীর্ঘসময় একটানা তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। যা ছিল অমানবিক, বর্বরোচিত। তারেক রহমানকে দুবার জেআইসিতে আনা হয়। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে টানা কয়েক দিন জেআইসিতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আবদুর রব খান তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের নির্দেশে তারেক রহমানের কাছ থেকে একটি জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। যে জবানবন্দিতে তারেক রহমান তাঁর ভুলের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চান বলে দাবি করা হয়। এই সময় কারা কারা উপস্থিত ছিলেন সেই তথ্যও বেরিয়ে এসেছে তদন্তে। চারজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা সারাক্ষণ উপস্থিত থেকে এই জবানবন্দি আদায় করেন। এর মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবদুর রব খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জাহিদ হোসেন ও মেজর (অব.) মনির। নির্যাতন চালিয়ে তারেক রহমানকে অনেকটা পঙ্গু করে ফেলা হয়।

স্বাভাবিকভাবেও তিনি হাঁটাচলা করতে পারতেন না। তাঁর ওপর নির্যাতনের একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এ সম্পর্কে একটি জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে তারেক রহমানের নানি মারা যান। এ সময় তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। সে সময় জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রত্যক্ষ করেন, তারেক রহমান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবদুর রব খান জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিনের নির্দেশে এ নির্যাতন চালানো হয়। তার নির্দেশে তারেক রহমানকে সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ওয়ারেন্ট অফিসার ফজলু জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ব্রিগেডিয়ার আমিন তাদেরকে বলেছেন- পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঝুলন্তই থাকবে। একপর্যায়ে সিলিং থেকে তিনি পড়ে যান এবং কোমরে প্রচণ্ড আঘাত পান। তদন্তকারী কর্মকর্তারা মনে করেন, মাসুদ উদ্দিন একা এসব নির্যাতনের পরিকল্পনা করেননি। তাঁর সঙ্গে ছিল সুশীল সমাজের একটি অংশ যারা এক-এগারোর মূল পরিকল্পনাকারী। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, সেনাবাহিনী বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের পক্ষে ছিল না। কিন্তু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিশেষ করে, দুই সম্পাদক তাদের গ্রেপ্তারের জন্য রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।

এক-এগারোর সময়, ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিদের তথাকথিত দুর্নীতিবাজ বানিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল। তাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করা হয়েছিল। বহু শিল্প উদ্যোক্তাকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার করে মাসের পর মাস কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল। এসবই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় অপরাধ। তাই, এখনই সময়। এক-এগারোর সময় সংঘটিত সব অপরাধ তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। নির্মোহভাবে সেই কালো অধ্যায় জাতির সামনে উন্মোচন করা প্রয়োজন। যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এভাবে ক্ষমতা দখল করতে না পারে। এর সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

একটি ষড়যন্ত্রের পথ চিরতরে বন্ধ করার জন্য তার উৎস খুঁজতে হয়। সঠিক উৎসমুখ খুঁজে পেলে তা পুরোপুরি বন্ধ করতে হয়। উৎস বন্ধ করতে না পারলে ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন করে সুযোগ নেয়। এক-এগারো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি দুষ্টক্ষত। ২০০৭ সালে দীর্ঘ মেয়াদে অনির্বাচিত সুশীলদের রাজত্ব কায়েমের যে ষড়যন্ত্রের বীজ রোপিত হয়েছিল তার শেকড় এখন অনেক গভীরে। এক-এগারোর আসল ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো বহাল তবিয়তে। ২০০৭ সালের চেয়েও তারা বেশি শক্তিশালী। কারণ, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গণতন্ত্র বিরোধী এই বিরাজনীতিকরণের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বিভিন্ন থিংক ট্যাংকের মাধ্যমে তারা নিজেদের সংগঠিত করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে শেষ সময় পর্যন্ত তারা নির্বাচন ভণ্ডুলের চেষ্টা করেছিল। কাজেই গণতন্ত্র এবং নির্বাচন তারা মেনে নিয়েছে এটা ভাবলে ভুল হবে। তারা নতুন করে পরিকল্পনা সাজাতে চেষ্টা করছে। নতুন করে আবার সংগঠিত হচ্ছে। এক-এগারোর ষড়যন্ত্র এবং গণতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে না। তাই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেপ্তার দেখানো একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। অবিলম্বে এক-এগারোর ঘটনা তদন্তের উদ্যোগ নেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, এটাই জনগণের প্রত্যাশা।