দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালোভাবে চলছে না। বর্তমানে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের (ভিসি) পদত্যাগসহ নানা দাবিতে আন্দোলন চলছে। এমনকি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে কমপ্লিট শাটডাউন পালন করা হচ্ছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) ভিসির অপসারণের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভাল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থাকলেও তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।
সূত্র মতে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রায় তিন মাসে আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি ও ইউজিসি চেয়ারম্যান পরিবর্তন করা হয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রায় দেড় ডজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পরিবর্তনে কাজ চলছে। একই সঙ্গে প্রোভিসি পদেও পরিবর্তন আনা হবে। তবে এই পরিবর্তন একবারে না করে ধাপে ধাপে করা হবে।
সূত্র মতে, প্রথম ধাপে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পরিবর্তন হতে পারে। এ ছাড়া পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পরিবর্তনের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ বা পরিবর্তন একটা চলমান প্রক্রিয়া। তবে কোনো দাবিকে কেন্দ্র করে শিক্ষকরা ক্লাস বন্ধ করতে পারেন না, তাঁরা কাউকে জিম্মি করতে পারেন না। তাঁদের যদি কোনো দাবি থাকে তাহলে তাঁরা স্থানীয় এমপিদের বলতে পারেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আসতে পারেন। আমরা তা সমাধান করব।’
সূত্র জানায়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ থেকে ৪০টি প্রশাসনিক পদ রয়েছে। মূলত ভিসিপন্থী বা সরকারদলীয় শিক্ষকদের ওইসব পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর, ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা, প্রভোস্ট, সহকারী প্রভোস্ট অন্যতম। কিন্তু যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা বিএনপিপন্থী নন সেখানে এসব প্রশাসনিক পদে দলীয় শিক্ষকরা দায়িত্ব পাচ্ছেন না। যা নিয়ে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। আবার পদাধিকারবলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিন্ডিকেট বা রিজেন্ট বোর্ডে এমপিরা সদস্য হয়েছেন। তাঁরা এরই মধ্যে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বা নিয়োগে বাগড়া দিয়েছেন। এটি নিয়েও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। এতে এক পক্ষ ভিসির বিপক্ষে অবস্থান নিলে অন্য পক্ষ পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে অনুমোদিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৭। এর মধ্যে বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের সময়ে হয়েছে। বিশেষ করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়েছে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের বেশির ভাগই আওয়ামী ঘরানার। সেখানে বিএনপিপন্থী শিক্ষক ভিসি হিসেবে গেলেও পুরোপুরি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছেন না। আবার আওয়ামী সুবিধাভোগী কেউ কেউ এখন বিএনপি সেজে আবারও প্রশাসনিক পদগুলো দখলে নিচ্ছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা থেকেই যাচ্ছে।
জানা যায়, পদোন্নতি জটিলতা নিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) শিক্ষকদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলছে। গত সোমবার থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষকরা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকেও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
শিক্ষকদের দাবি ও চলমান আন্দোলনের মধ্যে পদোন্নতিসংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে গত ৩০ এপ্রিল উপাচার্য, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও আন্দোলনরত শিক্ষকদের প্রতিনিধিদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়। কিন্তু ৯ মে সিন্ডিকেট সভা হলেও কোনো সমাধান হয়নি।
গত ২১ এপ্রিল শিক্ষকদের পদোন্নতির দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষকরা প্রথমে কর্মবিরতি, শাটডাউন এবং সর্বশেষ ২৮ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে পড়ে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) উপাচার্য ড. কাজী রফিকুল ইসলামের অপসারণ দাবিতে চলা অবস্থান কর্মসূচিতে বহিরাগতদের হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের শিক্ষক-কর্মকর্তারা প্রশাসনিক ভবনের সামনে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। এ সময় ভিসির পক্ষে শতাধিক বহিরাগত ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে কর্মসূচিতে বাধা দেয়। এতে শিক্ষকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে সোমবার বিকেলে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই ঘটনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্য ড. মো. শওকত আলীর পদত্যাগ দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের উপস্থিতিতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা ও সংবাদ সম্মেলন পণ্ড করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গত শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে উপাচার্যের পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের বক্তব্য চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেখানে হট্টগোল সৃষ্টি করেন এবং এক পর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন বন্ধ করে দেন। এ সময় ধাক্কাধাক্কি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সম্প্রতি সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সাদা দলের শিক্ষকদের হাতাহাতি ও বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। সাদা দলের শিক্ষকদের অভিযোগ, উপাচার্যের নেতৃত্বে প্রক্টরসহ কয়েকজন তাঁদের ওপর হামলা চালান। তাঁদের এক শিক্ষক ঠোঁটে আঘাত পেয়েছেন এবং অন্যদেরও কিল-ঘুষি মারা হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দাবি, শান্তিপূর্ণ আলোচনায় না গিয়ে মব সৃষ্টি করতে সাদা দলের এক পক্ষের শিক্ষকরা তাঁর কক্ষে গিয়েছিলেন। তাঁদের হামলায় তাঁর হাতের আঙুল ফেটে গেছে। সেখানে উপস্থিত অন্য শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ওপরও হামলা করা হয়েছে, যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
গত সপ্তাহে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামে শাখা ছাত্রদল। উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অবমাননার অভিযোগ আনেন তাঁরা। উপাচার্যের কার্যালয়ে তালাও দেন। যদিও পরে শিক্ষার্থীরা তাঁদের আন্দোলন স্থগিত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আতিয়ার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পের একজন করাপ্টেড পিডি শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে আন্দোলনে নামায়। শিক্ষার্থীরা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এখন তারা আন্দোলনে নেই। তবে আমরা জেনেছি, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পরিবর্তন হবে। এখানেও হয়তো হবে। সামনে দেখা যাক, কী হয়!’
সম্প্রতি জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য সৃষ্টির অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রোভিসির পদত্যাগের দাবির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ায় ভিসি-প্রোভিসি ও অন্য শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে, যা নিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টর পদত্যাগ করেছেন।