Image description

এনআইডিতে বয়স সংশোধনের ক্ষমতা এককভাবে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) মহাপরিচালকের (ডিজি) হাতে। বয়স সংশোধন ঘিরে নির্বাচন কমিশনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইসি’র কর্মকর্তাদের অনিয়ম দুর্নীতির কারণে এখন ভুগছেন সাধারণ মানুষ। বয়সের সামান্য ভুল সংশোধনের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসতে হচ্ছে রাজধানীতে। বেড়েছে সময় ও অর্থের অপচয়। সেই সঙ্গে পড়তে হচ্ছে সীমাহীন ভোগান্তিতে। সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া, হয়রানীসহ নানা অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

সরজমিন দেখা যায়, আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বয়স সংশোধনের জন্য মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন খুলনা থেকে, কেউ এসেছেন, চট্টগ্রাম থেকে, আবার কেউ এসেছেন পঞ্চগড় থেকে। সবার মুখে হতাশা আর ক্লান্তির ছাপ।

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলা থেকে বয়স সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আসেন মো. রুবেল ইসলাম। সার্টিফিকেটের চেয়ে এনআইডিতে বয়স ৬ বছর বেশি। তিনি জানান, ভুল সংশোধন করতে তিনি ৭ বছর ধরে ঘুরছেন। ২০১৯ সালে প্রথম উপজেলা নির্বাচন অফিসে ভুল সংশোধনের জন্য আবেদন করেন। সেখান থেকে নিষ্পত্তির জন্য জেলা নির্বাচন অফিসে পাঠানো হয়।

দিনাজপুর জেলা নির্বাচন অফিসে ভুল সংশোধনের জন্য দালালচক্র তার কাছে টাকা চায়। টাকা দিতে রাজি না হলে সংশোধনের বিষয়টি বিভাগে পাঠানো হয়। রংপুর বিভাগীয় নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য দিনাজপুর জেলা নির্বাচন অফিসে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তারাই নিষ্পত্তি করতে পারবেন। বিভাগীয় অফিসের প্রয়োজন নেই। এরপর তিনি ফের দিনাজপুর জেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করেন। সেখানে বিভিন্ন বাহানায় সংশোধন আটকে রাখা হয়।

এরই মধ্যে বয়স সংশোধনের ক্ষমতা এনআইডি মহাপরিচালকের হাতে চলে যায়। এখন দিনাজপুর থেকে ঢাকায় আসতে হয়েছে। একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলামের ক্ষেত্রেও। তার প্রকৃত জন্মসাল ২০০৪ হলেও এনআইডিতে ২০০৮ উল্লেখ রয়েছে। এজন্য তার ভর্তি ও পরীক্ষা সংক্রান্ত কাগজপত্রে অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। এই ভুল সংশোধনের জন্য তাকে ব্রাহ্মবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা থেকে আসতে হয়েছে ঢাকায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রিতু আক্তারের জন্মতারিখে মাত্র দুই মাসের গরমিল। এই ভুল সংশোধন করতেই তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ ভোগান্তির পথ। নির্বাচন কমিশনে এসেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সমাধান। এক দপ্তর থেকে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন তিনি। রিতু আক্তার বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এনআইডি সংশোধনের জন্য ঘুরছি। মাত্র দুই মাসের বয়স সংশোধন করতে হবে। এজন্য আমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসতে হয়েছে। প্রথমে কয়েকদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় অফিসে গিয়েছিলাম। পরে আমাকে ঢাকায় আসতে বলা হয়। এখানে এসে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে।

একই চিত্র ষাটোর্ধ্ব আশিক প্রামাণিকের ক্ষেত্রেও। মালয়েশিয়া প্রবাসী ছেলের এনআইডি’র বয়স সংশোধনের জন্য তিনি নাতিকে নিয়ে রাজধানীর নির্বাচন কমিশন ভবনের এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘুরছিলেন। সময়মতো সংশোধন না হলে ছেলের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব হবে না জানিয়ে আশিক প্রামাণিক বলেন, আমি মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছি। আমার ছেলে রুবেল প্রামাণিক মালয়েশিয়ায় থাকে।

এনআইডিতে বয়স সংশোধন না করলে তার ভিসার মেয়াদ বাড়ানো যাচ্ছে না। দেড় মাস ধরে ইসি’র পেছনে ঘুরছি। ছেলের ভিসার মেয়াদ আর মাত্র ১০ দিন আছে। এর মধ্যে সংশোধন না হলে তাকে দেশে ফিরে আসতে হবে। আমাদের পুরো পরিবার তার আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, এই ভোগান্তির মূল কারণ নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক প্রবিধান সংশোধন। আগে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও বয়স সংশোধন করতে পারতেন। উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ৩ বছর, অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ৫ বছর, সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ৭ বছর, অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ৮ বছর এবং আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ১০ বছর পর্যন্ত বয়স সংশোধন করতে পারতেন।

ফলে স্থানীয় পর্যায়েই অধিকাংশ আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হতো। কিন্তু নতুন নিয়মে এই ক্ষমতা এককভাবে মহাপরিচালকের হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। এতে আবেদন নিষ্পত্তি ধীর হয়ে পড়েছে এবং ভোগান্তি বেড়েছে বহুগুণ। তারা বলেন, অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বয়স সংশোধন এবং নাগরিকদের হয়রানির অভিযোগের প্রেক্ষিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই ক্ষমতা বাতিল করা হয়। অনিয়মকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বয়স সংশোধন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্রীভূত করায় জট তৈরি হয়েছে। সামনে আরও হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল হাসনাত মুহম্মদ আনোয়ার পাশা বলেন, আমি নতুন দায়িত্ব পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আগে কাছাকাছি সংশোধনের সুযোগ ছিল। এতে সংশোধন আবেদনের প্রবণতা বেশি দেখা যেতো। এখন কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাই-বাছাই হওয়ায় এই প্রবণতা কমবে। নতুন এ নিয়মে অনিয়মও কমবে। তবে জনগণের ভোগান্তি কমাতে প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে।