লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে চলমান সংঘাতে আবারও প্রাণ গেল সাতক্ষীরার এক প্রবাসী যুবকের। ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন কলারোয়া উপজেলার শুভ কুমার দাস (২৮)। এর মধ্য দিয়ে লেবাননে হামলায় নিহত সাতক্ষীরাবাসীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল তিনজনে।
সোমবার (১১ মে) রাতে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে চলাচলের সময় ড্রোন হামলার শিকার হন শুভ কুমার দাস। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার (১২ মে) সন্ধ্যায় পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও সরকারি পর্যায়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
নিহত শুভ কুমার দাস উপজেলার শ্রীপ্রতিপুর গ্রামের সুরঞ্জন দাসের ছেলে। প্রায় তিন বছর ধরে তিনি লেবাননে অবস্থান করছিলেন। সেখানে একটি বাড়ি ও সংলগ্ন ফলের বাগান দেখাশোনার কাজ করতেন।
মঙ্গলবার দুপুরে শুভর মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছালে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা জানান, পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন শুভ। নিয়মিত পরিবারের কাছে টাকা পাঠিয়ে সংসারের হাল ধরেছিলেন তিনি। কিন্তু জীবিকার সন্ধানে যাওয়া সেই তরুণের মরদেহই এখন ফিরবে দেশে।
এদিকে একই দিনে লেবাননের নাবাতিহ জেলার জেবদিন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) ও আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের মো. নাহিদুল ইসলাম (২০)। বাংলাদেশ দূতাবাস, বৈরুত এক শোকবার্তায় তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দূতাবাস জানায়, সোমবার দুপুরে নিজ আবাসস্থলে অবস্থানকালে ইসরায়েলি এয়ার স্ট্রাইকে নিহত হন তারা।
শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম। বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানকে ঘিরেই ছিল তার ছোট্ট সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে বিদেশের মাটিতে দিনরাত পরিশ্রম করতেন তিনি। স্বপ্ন ছিল দুই মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করবেন, পরিবারের অভাব দূর করবেন এবং টিনের ঘরের বদলে পাকা বাড়ি তুলবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন থেমে গেছে যুদ্ধের আগুনে।
নিহত শফিকুল ইসলাম সদর উপজেলার আফসার আলী ও আজেয়া খাতুন দম্পতির ছেলে। প্রায় ১৮ বছর আগে আশাশুনি উপজেলার কুল্যা ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের রুমা খাতুনকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের সংসারে দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে মৌ আক্তার চাঁদপুর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়ে বৃষ্টি আক্তার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে চাঁদপুর কাওছারীয়া দাখিল মাদরাসায়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সংসারের হাল ধরতে মাত্র দুই মাস আগে লেবাননে যান শফিকুল। কষ্টের জীবন কাটালেও নিয়মিত পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকাতেই চলত বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ, মেয়েদের লেখাপড়া এবং পুরো সংসারের খরচ।
শফিকুলের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী রুমা খাতুন। কখনো স্বামীর ছবি বুকে জড়িয়ে নির্বাক হয়ে বসে থাকছেন, আবার কখনো দুই মেয়েকে আঁকড়ে ধরে আহাজারি করছেন। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অবস্থাও একই। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে যেন নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পুরো পরিবার।
নিহতের মা আজেয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে সংসারের একমাত্র ভরসা ছিল। বিদেশে থেকে কষ্ট করে আমাদের জন্য টাকা পাঠাতো। এখন আমার ছেলে আর বেঁচে নেই। আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছি। সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ, যেন দ্রুত সরকারি খরচে আমার ছেলের মরদেহ দেশে এনে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অন্তত শেষবারের মতো যেন ছেলেকে দেখতে পারি।’
প্রতিবেশী জিয়াউর রহমান বলেন, ‘শফিকুল অত্যন্ত শান্ত ও পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। পরিবারের সুখের জন্য নিজের জীবনটাকেই কষ্টের মধ্যে রেখেছিলেন। বিদেশে থেকেও পরিবারের খোঁজখবর নিয়মিত নিতেন।’
অন্যদিকে, আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের নিহত নাহিদুল ইসলামের বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। স্বজনরা জানান, পরিবারের সচ্ছলতার আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই তরুণেরও প্রাণ গেল যুদ্ধের ভয়াবহতায়।
কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘শুভ কুমার দাসের মৃত্যুর বিষয়টি এখনো সরকারিভাবে জানানো হয়নি। তবে খবর পাওয়ার পর পরিবারের কাছে লোক পাঠানো হয়েছে। আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়ার পর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পরিবারের পাশে থাকা হবে।’
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল বলেন, ‘জেলার তিনজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা লেবাননে হামলায় নিহত হওয়ায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনকে পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’
লেবাননে একের পর এক বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত সাতক্ষীরার হাজারো প্রবাসীর স্বজনরা এখন উৎকণ্ঠা আর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।