Image description
নাজমুস সাকিব নির্ঝর
 
বাংলাদেশ-মার্কিন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা বাণিজ্য চুক্তির সমালোচকরা একটি প্রশ্ন সযত্নে এড়িয়ে যাচ্ছেন:
এই চুক্তি ভেস্তে গেলে আসলে কার লাভ?
 
বাংলাদেশ যদি সরাসরি আমেরিকার সাথে ডিল করতে পারে, যদি এই কাজের জন্য মধ্যসত্ত্বভোগি বা ফড়িয়া হিসাবে ইন্ডিয়ার প্রয়োজন না হয়, সেটা ইন্ডিয়ার জন্য একটা জিওপলিটিকাল বা স্ট্র্যাটেজিক সমস্যা।
কিন্তু মার্কিন বাংলাদেশ চুক্তি হলে ইন্ডিয়ার কি কোনো অর্থনৈতিক বা ব্যবসায়িক ক্ষতি হবে?
 
আজকে দেখাব ডেটা কী বলে।
 
বাংলাদেশ প্রতি বছর বিশাল পরিমাণে তুলা কেনে। বছরে প্রায় ৮৫ লাখ বেল কাঁচা তুলা ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের শীর্ষ দুই আমদানিকারকের একটা। দেশে তুলা উৎপাদন হয় নামমাত্র—চাহিদার ২ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ, তৈরি পোশাক খাতের জন্য প্রতিটা বেলই আমাদের আমদানি করতে হয়।
 
ভৌগোলিক অবস্থান ও দ্রুত পৌঁছানোর সুবিধার কারণে কয়েক দশক ধরে এই তুলা সরবরাহে ভারত একচেটিয়া আধিপত্য ভোগ করে আসছে।
এই একচেটিয়া বাজার সুবিধার অঙ্কটা বিশাল। ইউএন কমট্রেড-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ভারতের তুলা রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৭০ কোটি ডলার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের এই দাপট আরও বেড়েছে: ২০২৩-২৪ বছরে বাংলাদেশের তুলা আমদানিতে ভারতের অংশ ছিল ২৩ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ।
এমনকি ২০২৪-২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ভারত থেকে বাংলাদেশে তুলা রপ্তানি বেড়েছে ২২.৬১ শতাংশ। শুধু কাঁচা তুলা নয়, ২০২৪ সালেই ভারত বাংলাদেশে ১৬০ কোটি ডলারের সুতা এবং প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের কৃত্রিম তন্তু রপ্তানি করেছে।
 
বাংলাদেশ-মার্কিন চুক্তির 'শূন্য-শুল্ক' সুবিধা সরাসরি এই বাজারকে হুমকির মুখে ফেলেছে। কারন চুক্তির শর্তটা পরিষ্কার: 0 tariff সুবিধা পেতে হলে বাংলাদেশি উৎপাদকদের অবশ্যই আমেরিকায় উৎপাদিত তুলা এবং man made fiber এর কাঁচামাল ব্যবহার করতে হবে। যেকোনো বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারক যদি শূন্য-শুল্ক সুবিধা নিতে চান, তবে তাকে মুম্বাইয়ের বদলে মেমফিস থেকেই তুলা কিনতে হবে।
কিভাবে ইন্ডিয়া বাংলাদেশে বাজার হারাচ্ছে ও হারাবে তার একটা প্রজেকশন গ্রাফ এখানে দিয়েছি।
 
ভারতীয় শেয়ার বাজার এই সংকটের গভীরতা সাথেসাথেই আঁচ করতে পেরেছে। বাংলাদেশ এই চুক্তি করার ঘোষণার পর ভারতের টেক্সটাইল ও স্পিনিং কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় ধস নামে: গোকালদাস এক্সপোর্টসের ৩ শতাংশ, নিতিন স্পিনার্সের ২.৫ শতাংশ, কেপিআর মিলসের ৫ শতাংশ এবং বর্ধমান টেক্সটাইলসের শেয়ার দর ৩ শতাংশ পড়ে যায় (মেরুন রঙের গ্রাফ দ্রষ্টব্য)।
বাজারের এই প্রতিক্রিয়া মোটেও অযৌক্তিক ছিল না। ভারতের মোট তুলা রপ্তানির ৭০ শতাংশেরই গন্তব্য বাংলাদেশ। মার্কিন চুক্তির শর্ত কার্যকর হলে তুলা রপ্তানির এই বিশাল ধাক্কা সামলাতে ভারতকে সম্পূর্ণ নতুন বাজার খুঁজতে হবে।
ভারতের এই উদ্বেগ কেবল তাত্ত্বিক নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলেই বাংলাদেশ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে, যার পাল্টা জবাবে নয়াদিল্লিও তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ দেয়। বাণিজ্যিক এই টানাপোড়েনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ফাটল ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—আর এই মার্কিন চুক্তি সেই চাপকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এটা এই চুক্তির ইকনমিক ইম্প্যাক্ট এর শুধু একটা মাত্র সেক্টরের চেহারা।
 
এজন্যই কি নর্থ ইন্ডিয়ান পুঁজি বাংলাদেশে দেখভাল করার দায় যাদের, তারা উঠে পড়ে লেগেছে এই চুক্তির বিরুদ্ধে কলাম, জবান ও মশাল নিয়ে?
আ্যবসলিউট টার্মে দেখলে অবশ্যই বাংলাদেশ-মার্কিন চুক্তিটা মার্কিন স্বার্থের অনুকুলে বেশি। কিন্তু এই সমস্যায় তো বাংলাদেশ একা পড়েনাই। অন্যান্য দেশও পড়েছে। বাংলাদেশের অন্যান্য কম্পিটিটর যেমন ইন্ডিয়া আরো বেশি করে ঝামেলায় পড়েছে। অনেকেই শূন্য শুল্কের কোনো সুবিধাই পায়নি।
 
সামগ্রিক ভাবে বিবেচনা করলে যে চিত্রটা ফুটে ওঠে, বিশেষত ইন্ডিয়ান লবী প্রভাবিত যে হাউকাউ সেটা যেকোনো বাংলাদেশি ন্যাশনালিস্টকে এই চুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলার আগে দুবার ভাবতে বাধ্য করবে।