Image description

সংসার শুধু ভালোবাসার সম্পর্ক নয়, এটি দায়িত্ব, সম্মান, ত্যাগ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক পবিত্র বন্ধন। ইসলাম পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই কিছু অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে। যেমন স্বামীর উপর স্ত্রীর হক রয়েছে, তেমনি স্ত্রীর উপরও স্বামীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধিকার রয়েছে।

 

বর্তমান সময়ে অনেক পরিবার ভেঙে যায় শুধু পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার অভাবে। অথচ ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে শান্তিময় করতে স্বামীকে সম্মান করা এবং তার হক আদায়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

তবে মনে রাখতে হবে— ইসলাম কখনো জুলুম, নির্যাতন বা অন্যায়ের সমর্থন করে না। বরং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে উৎসাহ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً

‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও; আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ (সুরা আর-রূম: আয়াত ২১)

স্বামীর মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী

১️. স্বামীর অধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ، لَأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا

‘আমি যদি কাউকে অন্য কারও জন্য সিজদা করার নির্দেশ দিতাম, তবে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম সে যেন তার স্বামীকে সিজদা করে।’ তিরমিজি ১১৫৯)

এই হাদিসের উদ্দেশ্য স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব ও সম্মানের গুরুত্ব বোঝানো; বাস্তবে আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা বৈধ নয়।

২️. স্বামীকে কষ্ট না দিতে জান্নাতের হুরদের সতর্কবাণী

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, স্ত্রী যখন স্বামীকে কষ্ট দেয়, তখন জান্নাতের হুররা বলে—

لَا تُؤْذِيهِ، قَاتَلَكِ اللَّهُ، فَإِنَّمَا هُوَ عِنْدَكِ دَخِيلٌ، يُوشِكُ أَنْ يُفَارِقَكِ إِلَيْنَا

‘তুমি তাকে কষ্ট দিও না। সে তো তোমার কাছে অল্প সময়ের অতিথি; শীঘ্রই সে তোমাকে ছেড়ে আমাদের কাছে চলে আসবে।’ (তিরমিজি ১১৭৪)

এ হাদিস দাম্পত্য জীবনে কোমল আচরণ ও সম্মান বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে।

৩️. স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজা নয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا تَصُومُ الْمَرْأَةُ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ

‘স্বামী উপস্থিত থাকলে স্ত্রীর জন্য তার অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখা বৈধ নয়।’ (বুখারি ৫১৯৫, মুসলিম ১০২৬)

এটি স্বামীর দাম্পত্য অধিকারের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য বলা হয়েছে।

৪️. স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীর ইদ্দত ও শোক

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا

‘আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য তিন দিনের বেশি কারও মৃত্যুতে শোক পালন বৈধ নয়; তবে স্বামীর মৃত্যুতে চার মাস দশ দিন।’ (বুখারি ১২৮০)

এ বিধান স্বামীর মর্যাদা ও দাম্পত্য সম্পর্কের গভীরতার প্রতিফলন।

 

 

৫️. স্বামীর প্রতি অকৃতজ্ঞতার ভয়াবহতা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَى امْرَأَةٍ لَا تَشْكُرُ لِزَوْجِهَا

‘আল্লাহ সেই নারীর দিকে তাকাবেন না, যে তার স্বামীর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়।’ (নাসাঈ ৯০৮৯)

কৃতজ্ঞতা একটি সুন্দর সম্পর্কের প্রাণ। স্বামীর ভালোবাসা, পরিশ্রম ও দায়িত্বের মূল্যায়ন করা ইসলামের শিক্ষা।

৬️. স্বামী— জান্নাত কিংবা জাহান্নামের কারণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

فَإِنَّهُ جَنَّتُكِ وَنَارُكِ

‘স্বামীই তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম।’ (মুসনাদে আহমাদ ১৯০২৫)

অর্থাৎ স্বামীর হক আদায় ও তার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে একজন স্ত্রী জান্নাতে যেতে পারে।

ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা

ইসলাম শুধু স্ত্রীদের দায়িত্বের কথাই বলেনি; স্বামীদের প্রতিও কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ

‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি ৩৮৯৫)

অর্থাৎ একজন উত্তম স্বামী সেই, যে স্ত্রীর সঙ্গে ভালো আচরণ করে, তাকে সম্মান দেয় এবং তার হক আদায় করে।

দাম্পত্য জীবন তখনই সুন্দর হয়, যখন সেখানে থাকে পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও আল্লাহভীতি। ইসলাম স্বামীকে যেমন সম্মান দিয়েছে, তেমনি স্ত্রীকেও মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে। তাই একজন স্ত্রীর উচিত স্বামীর হক আদায় করা, তাকে সম্মান করা এবং সংসারে শান্তি বজায় রাখতে আন্তরিক হওয়া। পাশাপাশি একজন স্বামীরও দায়িত্ব— স্ত্রীর প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও উত্তম আচরণ করা। কারণ সুখী পরিবারই একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি, আর আল্লাহভীতির উপর গড়ে ওঠা সংসারই দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত শান্তির কারণ।