অনিয়ম করে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সুপারস্টার গ্রুপকে নির্ধারিত সীমার ৪৬ গুণ বেশি অর্থ ঋণ দিয়েছে বেসরকারি খাতের প্রিমিয়ার ব্যাংক। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মূল্যায়ন ছাড়া বন্ধকি জমির দলিল বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে রেজিস্ট্রি করে এই ঋণ দেওয়া হয়েছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছে ব্যাংকটি।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সুপারস্টার গ্রুপ (এসএসজি) ১৯৯৪ সালে নারায়ণগঞ্জে ইনক্যান্ডিসেন্ট ল্যাম্প প্ল্যান্টের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়। প্রতিষ্ঠানটি মূলত লাইটিং, ফ্যান, কেবল, ওয়্যারিং অ্যাক্সেসরিজ এবং সোলার পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করে থাকে। কোম্পানিটির বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন জালাল উদ্দীন। কোম্পানিটির কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লিফটসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাও রয়েছে।
জানা গেছে, যে মৌজার জমি বন্ধক রেখে সুপারস্টার গ্রুপ প্রিমিয়ার ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে, সেই জমির বিপরীতে নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৯৯ লাখ টাকা ঋণ পেতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। তবে অনিয়ম করে জমির মূল্য অনেকগুণ বাড়িয়ে দেখিয়ে মোট ৪৬ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে সুপারস্টার গ্রুপকে, যার অনুমিত সীমার ৪৬ গুণেরও বেশি। এ সংক্রান্ত নথি কালবেলার হাতে রয়েছে।
এটিই প্রথম নয়, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ঋণ জালিয়াতি, অর্থপাচার ও হুন্ডিতে সহায়তা, আবার কখনো আমদানি নীতি লঙ্ঘনের মতো অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে। এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্তেও নেমেছে।
প্রশ্ন উঠেছে ব্যাংকটির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের সক্ষমতা নিয়েও। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের আগস্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সাত সদস্যের নতুন পর্ষদ গঠন করে। প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান এবং উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার আরিফুর রহমানকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনিই ব্যাংকের কার্যক্রম তদারক করছেন। নানা অনিয়ম ও লোকসান থেকে বের হতে না পারায় বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের প্রতিও অসন্তোষ জানিয়েছেন শেয়ারহোল্ডার ও ব্যাংকটির কর্মকর্তারা। সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির হিসাব অনুসারে শেয়ারপ্রতি ৮ টাকা লোকসান হয়েছে। এতে শেয়ারহোল্ডার ও ব্যাংকটির কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলেছেন পর্ষদের সততা ও দক্ষতা নিয়ে।
৪৭৮ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদক: দুর্নীতির মাধ্যমে প্রিমিয়ার ব্যাংক মহাখালী শাখা থেকে সাত প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণের নামে ৪৭৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তের পর এরই মধ্যে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহাথীর মুহাম্মদ সামীর নেতৃত্বে দুই সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধান টিম অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করে যাচাই-বাছাই করছে বলে জানা গেছে। দুদকের জনসংযোগ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রিমিয়ার ব্যাংক মহাখালী শাখার সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক রানা আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ আবসার ও অন্যদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে ঘুষ গ্রহণসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ৭টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণের নামে ৪৭৮ কোটি টাকা তছরুপ করা হয়েছে। অনুসন্ধান পর্যায়ে ২০২৫ সালের ১৮ মে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মহাখালী শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক রানা আব্দুল্লাহ আল আবসারকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আমদানি জালিয়াতি: অস্বাভাবিক কম দর দেখিয়ে ভারত থেকে ১২৫ কোটি টাকার আমদানি করেছে পুরান ঢাকার প্রতিষ্ঠান গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজ। তিন বছর ধরে যে প্রতিষ্ঠান থেকে বেশিরভাগ আমদানি দেখানো হয়, সেটি মূলত শাড়ি-গহনা বিক্রেতা। অর্থ পাচার সন্দেহে এখন পুরো ঘটনা তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রাথমিকভাবে তিন বছরে গোলাপ শাহ এন্টারপ্রাইজের মোট ২৩১টি এলসির বিপরীতে প্রায় এক কোটি ৩ লাখ ডলারের আমদানির তথ্য পেয়েছে। দেশের যে তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে এ আমদানি করা হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রিমিয়ার ব্যাংক। ব্যাংকটির মাধ্যমে ৪৬টি এলসির বিপরীতে ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকার আমদানি হয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের অনিয়ম উদ্ঘাটন করে শাস্তির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রিমিয়ার ব্যাংকের কাছেও আমদানি সীমা লঙ্ঘন এবং বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দরে ফলসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলছেন, এখানে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি নিশ্চিত। কম দরে আমদানি দেখিয়ে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে; একই সঙ্গে বাকি অর্থ বিদেশে পরিশোধ করা হয়েছে হুন্ডিতে।
খেলাপি ঋণে জর্জরিত: বর্তমানে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মোট ঋণের ২৭ শতাংশই খেলাপি। বিগত চার মাসে (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) প্রায় ৫২৩ কোটি টাকা ক্যাশ রিকভারি করায় খেলাপির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রিমিয়ার ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ছিল ৩ হাজার ৭৮২ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩০.৪৪ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ হাজার ৯৫৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৪২ শতাংশ। ওই সময় পুনঃতপশিলের সুযোগ নিয়ে খেলাপি কমানোর পর ১০ হাজার ১৭৭ কোটি ১২ লাখ টাকা দাঁড়িয়েছিল।
খেলাপি ঋণের এই উল্লম্ফনের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকটিকে বড় অঙ্কের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রভিশন রাখার ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি ব্যর্থ হয়েছে। তাদের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৮ কোটি টাকা।
লভ্যাংশ দিতে পারেনি: দুরবস্থায় পড়া ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্ত করতে গত বছরের ১৩ মার্চ শেয়ারের বিপরীতে লভ্যাংশ ঘোষণার নীতিমালা শীর্ষক একটি বিধান করা হয়। সেখানে বলা হয়, কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ হলে ওই ব্যাংক আর লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এই তালিকায় রয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি প্রিমিয়ার ব্যাংক।
টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা: প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসিতে বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে প্রায় ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছে দুদক। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এ মামলা করা হয়।
দুদক জানায়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ২০২০ সালে পাঁচটি কার্যাদেশের বিপরীতে বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে এই অর্থ আত্মসাৎ করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান, একাধিক পরিচালক, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং একটি বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান মাইন্ডট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রয়েছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২০২০ সালে প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য মাইন্ডট্রি লিমিটেডকে মোট ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার পাঁচটি কার্যাদেশ প্রদান করে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি চ্যানেলে নির্দিষ্ট সময় বিজ্ঞাপন প্রচারের কথা থাকলেও বাস্তবে চুক্তির অর্ধেক সময়েরও কম বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। রেকর্ডপত্র ও সংশ্লিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেলের ট্রান্সমিশন সার্টিফিকেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, যেখানে মোট ২,৪০০ মিনিট বিজ্ঞাপন প্রচারের চুক্তি করা হয়েছিল, সেখানে মাত্র ১,২০০ মিনিট বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়। অথচ পূর্ণ অর্থের বিল দাখিল ও অনুমোদন নেওয়া হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পাঁচটি কার্যাদেশের বিপরীতে মাইন্ডট্রি লিমিটেডকে মাত্র ১ কোটি ৮ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, বাকি ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভুয়া রেকর্ড ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এ ছাড়া ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বিজ্ঞাপন বাবদ মাইন্ডট্রি/মাইন্ডট্রি লিমিটেডের নামে মোট ৪৩৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার বেশি অগ্রিম অর্থ জমা দেওয়া হয়, যার মধ্যে দীর্ঘদিন পর কার্যাদেশ দেখিয়ে একটি বড় অংশ সমন্বয় করা হলেও প্রায় ৯৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা এখনো অসমন্বিত রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন—প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল, ব্যাংকের একাধিক পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং মাইন্ডট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল আল মাহমুদ।
দুদক জানায়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মামলা করা হয়েছে।
ইকবাল পরিবারের অনিয়ম: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, ২০২০ সাল থেকে ৪০ মাসেরও বেশি সময় ধরে সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল ও তার পরিবারের সদস্যরা বনানীর ইকবাল সেন্টারের ২০ ও ২১ তলার ভাড়া বাবদ ১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা নিয়েছেন। অথচ ব্যাংক ওই ফ্লোরগুলো ভাড়া নেয়নি বা ব্যবহারও করেনি।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ইকবাল ও তার পরিবারের মালিকানাধীন ইকবাল সেন্টারে অবস্থিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে এটা ব্যাংকিং বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। সাবেক সংসদ সদস্য ইকবাল প্রিমিয়ার গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডেরও চেয়ারম্যান।