রাজধানীতে এখন আর টানা বর্ষণের প্রয়োজন হয় না। এক-দেড় ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিই যথেষ্ট। মুহূর্তেই সড়ক ডুবে যায়, অলিগলি হয়ে ওঠে খাল, থেমে যায় যান চলাচল। অফিসফেরত মানুষ জুতা হাতে হাঁটেন হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে।
সোমবার দুপুরের বৃষ্টির পর রাজধানীর ভাটারা, নূরেরচালা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, লালমাটিয়া, উত্তরা, বনশ্রীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। অনেক এলাকায় বৃষ্টি থেমে যাওয়ার ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরও পানি নামেনি।
ভাটারা-নূরেরচালায় বৃষ্টি মানেই পানিবন্দি জীবন : ভাটারা এলাকার সোলমাইদ, নূরেরচালাসহ বিভিন্ন অলিগলিতে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। বিশেষ করে সোলমাইদ মমতাজ বাজার থেকে খন্দকার বাড়ির মোড় পর্যন্ত সড়ক এবং আশপাশের গলিগুলোতে পানি জমে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
সোমবার দুপুরের বৃষ্টির পর সোলমাইদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বড় অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে।
সোলমাইদ সড়কের ব্যবসায়ী আহসান হাবীব বলেন, ‘বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনের ময়লা পানি মিশে সড়কে হাঁটার মতো পরিবেশ থাকে না। সকালে বৃষ্টি হলে দুপুর পর্যন্ত পানি থাকে।
নিচু এলাকা হওয়ায় নূরেরচালায় প্রতি বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। নূরেরচালা বাজার থেকে বোটঘাট পর্যন্ত সড়ক এবং ভেতরের অলিগলি প্রায়ই পানিতে তলিয়ে যায়। মাঝারি বৃষ্টিতেই যান চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।
নূরেরচালা বাজারের ব্যবসায়ী আলী হোসেন বলেন, ‘একবার পানি জমলে সরতে অনেক সময় লাগে। তখন পুরো এলাকার স্বাভাবিক জীবন থেমে যায়।’
মিরপুরে সড়ক যেন ছোট নদী : সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে কাজীপাড়া, মিরপুর-১০, মিরপুর-১ এবং আশপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি—সবখানেই থইথই পানি। দুই ঘণ্টার কম সময়ের বৃষ্টিতে নগরজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
কাজীপাড়ার বাসিন্দা আবু ইউসুফ বলেন, ‘এখানে এখন বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক। এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে পুরো দিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পানি নামতে নামতে রাত হয়ে যায়। ড্রেন আছে, কিন্তু পানি যাওয়ার পথ নেই। ওপরে মেট্রো রেলের এত সুন্দর স্থাপনা, আর নিচে জলাবদ্ধতা।’
টেকনিক্যাল মোড় থেকে বাঙলা কলেজ, পাইকপাড়া, সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার হয়ে মিরপুর-১০ পর্যন্ত সড়কের দুই পাশেই পানি জমে ছিল। কোথাও ফুটপাতও ডুবে যায়। বাস থেকে নামা যাত্রীদের হাঁটুপানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী সাজু বিশ্বাস বলেন, ‘বাস থেকে নামতে হলে হাঁটুপানিতে ভেজা ছাড়া উপায় নেই। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা দেখে আসতেছি, কিন্তু কোনো পরিবর্তন নেই।’
মিরপুর-১০ গোলচত্বরে পথচারী আশিকুর রহমান বলেন, ‘জলাবদ্ধতা কতটা ভয়াবহ, সেটা বোঝা যায় যখন ফুটপাতও ডুবে যায়। কিন্তু সমাধানে সিটি করপোরেশনের কোনো তৎপরতা দেখি না।’
ধানমণ্ডি-লালমাটিয়ায় হাঁটুপানি : ধানমণ্ডি, সোবহানবাগ, রাজাবাজার ও লালমাটিয়া এলাকাতেও ভারি বৃষ্টির পর হাঁটুপানি জমে থাকতে দেখা গেছে। নিউমার্কেট থেকে আসাদগেট পর্যন্ত মিরপুর রোড এবং পান্থপথ থেকে রাসেল স্কয়ার পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতে আট লেনের মিরপুর রোড ছোট খালের মতো হয়ে যায়। অনেক বাসের পাদানিতেও পানি উঠে যায়।
বিকাশ পরিবহনের যাত্রী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘১৫ বছর ধরে এই রাস্তায় চলাচল করছি। প্রতি বর্ষায় একই অবস্থা দেখি। এত বছরেও সমস্যার সমাধান হলো না।’
মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া জি-ব্লকের জাকির হোসেন রোডে আগের দিনের বৃষ্টির পানি জমে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই ই, এফ ও জি-ব্লকে পানি জমে যায়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এলাকায় বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। ড্রেনেজ সিস্টেম খুব একটা ভালো না।’
নতুন হাউজিং, কিন্তু নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা : মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন নতুন আবাসিক এলাকাগুলোতেও দেখা গেছে একই সংকট। চন্দ্রিমা হাউজিং, বসিলা সিটি হাউজিং, ওয়েস্ট ধানমণ্ডি হাউজিং ও মেট্রো হাউজিং এলাকায় বৃষ্টি হলেই কাদাপানি জমে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে হোল্ডিং ট্যাক্স দিচ্ছি। কিন্তু ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক হয়নি। বৃষ্টি হলেই রাস্তার গর্তে পানি জমে।’
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অর্পিতা অমি বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা কাদায় ভরে যায়। পাকা রাস্তা নেই, ড্রেনেজ সিস্টেমও নেই।’
কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের মুদি দোকানি শাহদাত হোসেন বলেন, ‘চার-পাঁচ মাস আগে রাস্তা কেটেছে সিটি করপোরেশন। এখনো কাজ শেষ হয়নি। বৃষ্টি হলে পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়।’
অল্প বৃষ্টিতেই ডোবে উত্তরা : কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক কামরুল ইসলাম ও সুজন মাহমুদ সরেজমিন ঘুরে জলমগ্ন উত্তরার নানা ভোগান্তির চিত্র দেখেছেন। ৩, ৫, ৯, ১৩ ও ১৭ নম্বর সেক্টর ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ড্রেনের ঢাকনা নেই। কোথাও ড্রেন ভেঙে গেছে, কোথাও ময়লা জমে পানি চলাচল বন্ধ। এর মধ্যে ৩ নম্বর সেক্টরের ৪, ৫, ৬, ৯ ও ১৩ নম্বর সড়কের ড্রেনগুলো একেবারেই ভেঙে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি ঠিকমতো প্রবাহিত হতে না পারায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা ড্রেনে ফেলা হলেও তা পরিষ্কারে কার্যকর উদ্যোগ নেই। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি উপচে রাস্তায় উঠে আসে।
নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘বারবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হলেও ঢাকার খাল, নালা ও পয়োনিষ্কাশন লাইনগুলো বর্জ্যে আটকে থাকছে। প্রকল্প ও বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এলাকাভিত্তিক মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, দুই সিটি করপোরেশনের পৃথক ব্যবস্থাপনার বদলে সমন্বিত পয়োনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা জরুরি। পাশাপাশি ড্রন ও নর্দমায় বর্জ্য ফেলা বন্ধে জনসচেতনতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও বাড়াতে হবে।