Image description
ত্রিবেদীর ঢাকা মিশন

বাংলাদেশে পরবর্তী ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে যোগ দিচ্ছেন দীনেশ ত্রিবেদী। আগামী জুনের মাঝামাঝি তার ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার হিসেবে বেছে নেয়া আপাতত ইতিবাচক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

কূটনীতিকদের মতে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিল্লি। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপথ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং চীনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের মতো ইস্যুতে ত্রিবেদীর এই নিয়োগ ‘রাজনৈতিক ভাবমূর্তি’ বাড়ানোর কৌশল হতে পারে। বিগত ইউনূস সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক একদম তলানীতে পৌঁছায়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, শরীফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের দেশে ফেরানো এবং সীমান্তে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়া বা পুশইনের বিষয়গুলোই ছিল ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে অবনতির মূল কারণ।

ঢাকায় গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্ষমতার মসনদে দলটি। এর আগে বাংলাদেশে ভারতের একমাত্র কমফোর্ট জোন ছিল শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ। তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সেই হিসাবনিকাশ পাল্টে দিয়েছে। এখন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা জরুরি। এক্ষেত্রে আগের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোই সামনে আসছে বারবার। বিশেষ করে শেখ হাসিনা কি দিল্লির আশ্রয়েই থাকবেন, নাকি তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া হবে তা এখনো অস্পষ্ট। পাশাপাশি শরীফ ওসমান হাদী হত্যায় জড়িতদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতা এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি। ফলে বিচারিক সহযোগিতা ও প্রত্যর্পণ চুক্তির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

সীমান্ত ইস্যুও বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্ত হত্যা, পুশইন, চোরাচালান এবং বিএসএফের আচরণ নিয়ে বাংলাদেশে জনমনে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। অন্যদিকে ভারত নিজেদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন ও ‘চিকেন নেক’ করিডোরের কৌশলগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ফলে সীমান্ত প্রশ্ন এখন কেবল নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক আস্থার বিষয়েও পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুধুমাত্র আমলাতান্ত্রিক যোগাযোগ যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে বিএনপি, বিভিন্ন ইসলামপন্থি দল, নাগরিক সমাজ ও নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ একজন প্রতিনিধির প্রয়োজন ছিল। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং দিল্লির ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকায় ত্রিবেদীকে সেই বিবেচনায় বেছে নেয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন: ত্রিবেদীকে হাইকমিশনার করা ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে বাড়তি কোনো প্রভাব রাখবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মানবজমিনকে বলেন, ভারত এখন বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে চায়। তাই হয়তো ত্রিবেদীকে রাষ্ট্রদূত করে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। অন্যদিকে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে পুনর্বিন্যাসের দাবি রাখে বলেও মনে করেন সাবেক এ রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগের মতো ভাবলে চলবে না। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে তা মেনে নিয়েই সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। ভারত বোধহয় এ বিষয়গুলো আমলে নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন আমেনা মহসিনও একই কথা বলেছেন। তার মতে, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ ভারতের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই দিল্লি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ অবস্থায় ফেলে রাখবে না। তাদেরকে এই দেশের জনগণের ইচ্ছা মেনে নিয়েই নতুন করে সম্পর্ক তৈরির পথ ঠিক করতে হবে। এক্ষেত্রে দিল্লি এমন একজনকে বেছে নিয়েছে যার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। আমেনা মহসিন বলেন, সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বোঝাপড়াটাও জরুরি। ত্রিবেদীকে বাছাই করার ক্ষেত্রে এটিও বড় কারণ হতে পারে। যেহেতু তিনি সরাসরি বাংলা জানেন।