দোকান থেকে খাবার কেনার সময় অধিকাংশ মানুষই প্যাকেটের গায়ে লেখা তথ্য গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। ফলে খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি আছে কি না, তা অনেকেরই অজানা থেকে যায়। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই প্রবণতা রুখতে মোড়কজাত খাবারের সামনের অংশে বিশেষ সতর্কবার্তা বা ‘ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং’ (এফওপিএল) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খসড়া ‘মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা ২০২৬’-এ উচ্চমাত্রার চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবারে বিশেষ সতর্কচিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে ভোক্তারা সহজেই বুঝতে পারবেন কোন খাবারটি তাঁদের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরনের ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবে খসড়া প্রবিধানমালায় অনেক খাদ্যপণ্যকে এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এতে অনেক কোম্পানি আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, ‘এই প্রবিধানটি বাস্তবায়িত হলে ভোক্তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পারবেন। লেবেলে শুধু সতর্কবার্তাই থাকবে না, নিরক্ষর মানুষের বোঝার সুবিধার্থে ছবিও ব্যবহার করা হবে।’ তবে বেশ কিছু পণ্যকে এই প্রবিধানের বাইরে রাখা নিয়ে তিনিও উদ্বেগ জানান।
আইনটিতে যা আছে
মোড়কজাত খাবারের প্যাকেটে সব তথ্য পরিষ্কার ও সহজভাবে লিখতে হবে। কোনো ধরনের ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া যাবে না। দেশে তৈরি খাবারের লেবেল অবশ্যই বাংলায় হতে হবে। বিদেশি খাবারের মূল লেবেল অন্য ভাষায় হলে তাতে আলাদাভাবে বাংলা স্টিকার বা সাব-লেবেল যুক্ত করা বাধ্যতামূলক। নতুন খসড়া প্রবিধানমালায় এই শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে।
খাবার প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের বিশেষ নিয়ম থাকলে তাও প্যাকেটে উল্লেখ করতে হবে। চিকিৎসক বা কোনো বিশেষজ্ঞের নাম ব্যবহার করে এমন কিছু লেখা যাবে না যাতে ক্রেতা বিভ্রান্ত হন। রোগ নিরাময় বা পুষ্টি নিয়ে কোনো মিথ্যা দাবি করা নিষিদ্ধ। তবে অনুমোদন নিয়ে গুণগত মানের সিল ব্যবহার করা যাবে।
খাবারের নামকরণের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট নিয়ম মানতে হবে। খাবারটি গুঁড়ো, ঘণীভূত, ধূমায়িত বা হিমায়িত কি না—তা নামের সঙ্গেই থাকতে হবে। কোন উপাদান কতটুকু ব্যবহার করা হয়েছে তার ওজন বা অনুপাত উল্লেখ করতে হবে। অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে এমন উপাদান যেমন—গম, রাই, যব, চিংড়ি বা কাঁকড়া থাকলে তার সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকতে হবে। জিনগত পরিবর্তিত খাবারের ক্ষেত্রে লিখতে হবে ‘জিএম খাদ্য’।
দুধ থেকে তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে ননীযুক্ত বা পাস্তুরিত কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে। ঘনীভূত বা মিষ্টি দুধের পাত্রে ‘শিশুদের উপযুক্ত নহে’ কথাটি পরিষ্কারভাবে লিখতে হবে। এ ছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম বা ১০০ মিলি খাবারে পুষ্টির পরিমাণও উল্লেখ করতে হবে।
প্রবিধানটি সম্পর্কে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘আইনটা যদি হয় তাহলে যারা মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং, মানে যে প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো মোড়কজাতকৃত, সেগুলো নিয়ম অনুসারে বিভিন্ন ধরনের যে পুষ্টি উপাদান, নিউট্রিশন প্যাক—কতটুকু কার্বোহাইড্রেট আছে, কতটুকু সুগার আছে, ফ্যাট আছে, চিনি, লবণ আছে—তা উল্লেখ করতে হবে।
‘এর মধ্যে কিছু উপাদান—যেগুলোকে বলা হয় ‘নিউট্রিয়েন্ট অব কনসার্ন’, অর্থাৎ মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগের, তা যদি খাদ্যে থাকে—তাহলে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যেমন লবণ ও চিনি। এগুলো কী পরিমাণ আছে, মোড়কের লেবেলে তা উল্লেখ করতে হবে। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এটি করতে উৎসাহিত করছে,’ বলেন এই অধ্যাপক।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘এটির ওপর অনেক জায়গা থেকে মতামত আসছে। এটি হারমোনাইজেশন করার জন্য আমাদের একটি কমিটি আছে—বিভিন্ন কোম্পানি, আমাদের স্পেশালিস্ট, ইউনিভার্সিটির শিক্ষক—সব মিলিয়ে ১২ জনের কমিটি আছে। তাঁরা একটি মিটিং করেছেন, আরও বোধ হয় সময় লাগবে।’
ষাটটির বেশি মতামত এসেছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন মতামতগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মোটামুটি কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। খুব শিগগিরই হয়তো আমরা এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করতে পারব। এই মতামতগুলো কম্পাইল করে আরেকটা কনসালটেশন মিটিং করাও লাগতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, ‘২০১৩ সালে একটি নিরাপদ খাদ্য আইন হয়েছে, সেটির অধীনে প্যাকেজিং রেগুলেশন ছিল। সেটিকে নতুন করে প্রণয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
‘যেটিকে ফ্রন্ট অব প্যাক ওয়ার্নিং লেবেলিং বলে। এটি আমরা দেওয়ার চেষ্টা করছি শুধু অতিরিক্ত চিনি, অতিরিক্ত লবণ, অতিরিক্ত চর্বি এবং তেল-চর্বিযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রে। যে খাবারগুলোতে নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি থাকে, সেখানে ওয়ার্নিং লেবেলটা বসানো থাকবে। অর্থাৎ সেসব মোড়কজাত খাদ্যের একদম সামনে সেই ওয়ার্নিং লেবেলগুলো থাকবে, যাতে ভোক্তারা বুঝতে পারেন যে এটির মধ্যে এটি বেশি আছে, যা তাঁদের জন্য ক্ষতিকর।’
অর্থাৎ প্যাকেটের সামনের অংশ দেখেই ভোক্তারা নিজেদের জন্য খাদ্য যাচাই করতে পারবেন বলে জানান পাবলিক হেলথ লয়ার নেটওয়ার্কের এই সদস্যসচিব। তিনি বলেন, ‘আগের যে প্যাকেজিং প্রবিধানমালা ছিল, সেটি ছিল সামনে-পেছনে সবকিছু মিলিয়ে। এই প্রবিধানমালার মধ্যে একটি অংশ হচ্ছে ফ্রন্ট অব প্যাক, আর বাকিগুলো হচ্ছে ব্যাক অব প্যাক বা অন্যান্য নিউট্রিশন সম্পর্কিত তথ্য।’
‘অন্যান্য নিউট্রিশনের মধ্যেও কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি আমরা, যেমন ফন্ট সাইজের ব্যাপারে। অনেক সময় দেখা যায়, ফন্ট সাইজ ছোট হওয়ার কারণে আমরা নিউট্রিশন তথ্য দেখতে পাই না। সেগুলোর ব্যাপারেও কিছু প্রবিধানমালা আছে। আবার ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিংয়ের একটি আলাদা শিডিউলও দেওয়া আছে।’
তিনি বলেন, এটি ভোক্তাদের অধিকারকে আরও বেশি সুরক্ষিত করবে।