Image description

রাজসভার কার্যক্রম চলছে। এ সময় রাজার কাছে এলো জরুরি টেলিফোন। টেলিফোন রেখে উত্তেজিত রাজা শহরমন্ত্রীকে বললেন, আপনি দ্রুত গোটা শহর দেখে আসেন। নগরে মানুষ কেমন আছে, তা দেখে বিকালের মধ্যে জানাবেন। একই নির্দেশ গেল নগর সেবায় নিয়োজিত প্রধান ব্যক্তির কাছে। দুজন হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে আবাসিক এলাকায় ঢুঁ দিয়ে কপালে উঠল চোখ। সেখানে বাড়ির গা ঘেঁষে নির্মাণ হয়েছে বাড়ি। কোথাও আলো-বাতাস চলাচলের জায়গা নেই। সরু পথ। ছোট্ট গলিতে বিশাল বিশাল ইমারত আর যানবাহনের জটলা। মূল সড়কের পাশে হাসপাতাল আর বাণিজ্যিক ভবন! নগরজুড়ে পার্কিং আর তারের জঞ্জাল। পথে পথে ময়লা আর আবর্জনার দুর্গন্ধ। প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ হয় একুশ শতকের নগরে। নির্বিচারে ফুটপাত-সড়ক দখল, প্রকাশ্যে চুরি ছিনতাইসহ অপরাধের শেষ নেই। ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা, ধুলো, গণপরিবহনের অভাব আর দিনের বেলায় চলার পথে মশার কামড়ে একেবারেই অস্থির দুই পর্যবেক্ষক।

বাড়ি বাড়ি কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে থাকা মানুষের মধ্যে এক অজানা আতঙ্ক। হাসপাতালে হাজারো রোগীর ভিড়, বিপদগ্রস্ত নাগরিকরা সহায়তা পেতে হাপিত্যেশ করছেন। পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে নাভিশ্বাস উঠেছে মানুষের। অর্ধশত কিলোমিটার পথ গাড়ি দেওয়ার পর সবুজের দেখা নেই। জলাশয় চোখে পড়েনি। গোটা শহরই যেন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক নগরীতে। ফেরার পথে বাসে রওনা দিলেন। ছোট্ট আসনের সামনে জায়গা কম থাকায় পা যেন ধরেই না। এর মধ্যে যানজটের মহা ভোগান্তি, শব্দের ভয়ংকর দূষণের মধ্যে আধা ঘণ্টার পথ আড়াই ঘণ্টায় পাড়ি দিয়ে ফিরলেন।

নাগরিক কষ্ট, দুর্ভোগ আর যন্ত্রণা দেখতে দেখতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে দুজন ফিরে এসে রাজার কাছে বললেন, অবস্থা ভয়াবহ। এ নগর আর বাসযোগ্য নয়। রাজার প্রশ্ন, আপনারা এত দিন এসব দেখেননি? সহজ জবাব- ঘুমিয়ে ছিলাম! এখন নাগরিক সুরক্ষায় যা কিছু প্রয়োজন করতে হবে। তাহলে আপনারা? জবাবে দুজন বললেন, আমাদের বাদ দিন। ঘুমের বদভ্যাসে আমাদের দিয়ে আর হচ্ছে না! নতুন পরিকল্পনায় এগিয়ে যেতে হবে।

১৮৬৪ সালের এক আগস্ট থেকে নাগরিক সেবা শুরুর পর রাজধানী ঢাকার আজকের চিত্র ঠিক ওপরের রাজদরবারের গল্পের মতো। এক কথায় এই নগরের মানুষ ভালো নেই। সিটি করপোরেশনকে উত্তরে দক্ষিণে বিভক্ত করলেও সেবা ও সেবার মান বাড়েনি। মানুষ বাড়ায় সংকট যেখানে ছিল অনেক ক্ষেত্রে ঠিক সেখানেই। সিটি করপোরেশনের মৌলিক কাজ ১৫টি। যদিও করপোরেশন আইনে ২৮ ধরনের কাজের কথা উল্লেখ আছে। প্রশ্ন হলো- সিটি করপোরেশন কি অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পারছে? এক কথায় বললে, মোটেই না। যদিও এজন্য রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতার পুরোনো গল্প।

অথচ শহর বড় হচ্ছে, সেবা ও সেবার মান বাড়ছে না। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নাগরিক যন্ত্রণা আর ভোগান্তি। মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ সামাজিক অপরাধ নগরের মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। মশার মতো কীট নিয়ন্ত্রণেও লাল বাতি। অন্যদিকে সেবা না বাড়িয়ে হোল্ডিং ট্যাক্সসহ নানা খাতে আয়ের উৎস বাড়িয়ে বাণিজ্য করছে সিটি করপোরেশন। আয় বাড়ানোর কাজটি সফলভাবে করছে। সব মিলিয়ে নগর অব্যবস্থাপনার দিক থেকে গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের অবস্থান প্রথম দিকেই হবে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা একটি নগর কীভাবে ঢেলে সাজানো দরকার, নাগরিকের চাহিদা কী, কী ধরনের সেবা নিশ্চিত করতে হবে, কোন পদক্ষেপে ভালো থাকবে নগরের মানুষ এসব প্রশ্ন নীতিনির্ধারকদের কাছে পরিষ্কার নয়। তাছাড়া উন্নত শহরগুলোতে কী ধরনের নাগরিক সেবা দেওয়া হচ্ছে সেটিও আমরা অনুসরণ করতে পারছি না। যেহেতু কোনো পরিবর্তন নেই তাহলে দায়িত্বশীলরা দাবানলে বসে মনের আনন্দে বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছেন এটাই প্রমাণিত সত্য।

সিটি করপোরেশনের মোট আয়তন কত? এই আয়তনের মধ্যে কত মানুষ স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারে? কত যানবাহন চলবে, কী পরিমাণ সড়ক, জলাশয়, প্রকৃতি, হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বাজার, ভবন প্রয়োজন এ নিয়ে কোনো ভাবনা আছে সিটি করপোরেশনের? যদি থাকত তাহলে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ ইচ্ছামতো যানবাহনের লাইসেন্স দিতে পারত না। শহরে এখন মানুষের হেঁটে চলা আর যানবাহনের গতি প্রায় সামান। অর্থাৎ যানবাহনের চাপে স্থবির হওয়ার পথে রাজধানী। তেমনি যেসব কারণে দূষণে প্রতিদিন গোটা বিশ্বের মধ্যে ঢাকার নাম দশের ঘরে জায়গা পাচ্ছে, এই সমস্যা সমাধানে নগর কর্তৃপক্ষকে পাগল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু নির্বিকার! 

২০২৫ সালের শেষের দিকে জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টস রিপোর্ট বলছে, ঢাকার জনসংখ্যা এখন ৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি। অথচ ২০২২ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী নগরে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহর ঢাকা। আর জনঘনত্বের দিক থেকেই রাজধানী ঢাকা বিশ্বের মধ্যে প্রথম সারিতে। আগামী ২০৫০ সালে জনসংখ্যার দিক থেকে জাকার্তা দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে প্রথম হবে রাজধানী ঢাকা। তখন এই শহরের জনসংখ্যা হবে ৫ কোটি ২১ লাখ।

কত বছরে ঢাকার জনসখ্যা সাড়ে ৩ কোটির ঘর অতিক্রম করল এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো ভাবনা আছে? তেমনি ২০৫০ সালে এই নগর নিয়ে জাতিসংঘ যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে এজন্য প্রতিষ্ঠান দুটির কোনো প্রস্তুতি আছে? তাহলে কি দেশের সব জনস্রোত ঢাকামুখী হবে? অথচ ২০ বছর ধরে আলোচনা চলছে জনস্রোত ঠেকানোর। তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়েও উল্লেখ করার মতো কিছুই হয়নি। যদি হতোই তাহলে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত কেন থামানো যাচ্ছে না? মানুষ বাড়ছে বলেই নাগরিক সংকটের মাত্রা বাড়ছে। বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সিটি করপোরেশনের সেবা কার্যক্রম।

উত্তর সিটি করপোরেশনের আয়তন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৬ বর্গকিলোমিটারে। এখানে রয়েছে ৫৪টি ওয়ার্ড। ৭৫টি ওয়ার্ড নিয়ে দক্ষিণ সিটির আয়তন ১০৯ বর্গকিলোমিটার। এই অংশে মোট জনবল ৮ হাজার ৪০৭ জন। দুই সিটি করপোরেশনে ২০১৬ সালে আটটি করে ১৬টি নতুন ইউনিয়ন যুক্ত হলেও সেবা বাড়েনি। করপোরেশনে যুক্ত হওয়া নতুন নতুন ইউনিয়নগুলোতে নাগরিক ভোগান্তির শেষ নেই। সেখানে চলমান নাগরিক সেবার অর্ধেকও পৌঁছায়নি। অন্ধকার পথে আলো আসেনি, সচল হয়নি ভাঙাচোরা পথ। 

কী করছে সিটি করপোরেশন?

সাধারণ মানুষ সিটি করপোরেশনের কাছে ভাত, কাপড় চায় না। বড় দাগে বললে সেবা আর নিরাপত্তা চায়। সিটি করপোরেশনের মৌলিক কাজের ১৫টির মধ্যে অন্যতম অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা। কর্তৃপক্ষ কি এ কাজে সফল? নগরে যে যার মতো করে যা ইচ্ছা তাই করছে। যে কোনো কারণেই হোক কর্তৃপক্ষ এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। গোটা নগরজুড়ে দখলের এক ভয়াবহ চিত্র।

২০২৪-এর তথ্য বলছে, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক যুগে (২০১৩-২০২৫) ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ৪ বছরেই সিটি করপোরেশনগুলো খরচ করেছে প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে রাজধানীর জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসন হয়নি। সিটি করপোরেশন তার এই মৌলিক কাজেও সফল হয়নি।

আবর্জনা অপসারণ ও সড়কের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনার অভাব আর এ খাতে রাজনীতির থাবা থেকে মুক্ত হতে পারেনি করপোরেশন। সেই সঙ্গে ময়লা পরিষ্কারের জন্য কর্তৃপক্ষ ৩০ টাকা মাসিক ভাতা নির্ধারণ করলেও প্রভাব খাটিয়ে নগরবাসীর থেকে ১২০ বা তার চেয়ে বেশি নেওয়া হলেও নির্বিকার কর্তৃপক্ষ। ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু, নবায়ন, নতুন হোল্ডিং নম্বর, হোল্ডিং ট্যাক্স, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এসব কাজেও নাগরিক ভোগান্তি চরমে। তবে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়, ট্রাক্স বাড়ানোর কাজে কোনো দুর্বলতা রয়েছে মনে করি না। জন্ম, মৃত্যু নিবন্ধনে ভুল হলে তা সংশোধন করতে গিয়ে যে পরিমাণ ভোগান্তি হয় এটা শুধু ভুক্তভোগীই বলতে পারেন।

সড়ক, বাজার, ফুটপাত নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এসব বিষয়ে হাজারো প্রশ্ন তোলা অমূলক নয়। কবরস্থান ও শ্মশানঘাটেও পর্যাপ্ত সেবা নেই। সেখানে অতিরিক্ত ফি, জায়গাসংকট, ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক সেবা নিয়ে অভিযোগ বিস্তর। ঐতিহ্যবাহী স্থান সংরক্ষণ করার দায়িত্ব যদি সিটি করপোরেশনের হয় তাহলে চোখের সামনে ঢাকার রাজনীতির সূতিকাগার পল্টন ময়দান, মুক্তাঙ্গন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, কর্তৃপক্ষ কী করেছে? এর বাইরে নগরীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় সিটি করপোরেশন কী অবদান রাখতে পেরেছে?

পার্ক ও খোলা জায়গা রক্ষার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হলেও ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে রক্ষক। পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ধূপখোলা মাঠে নির্মাণ করা হচ্ছে মার্কেট। শ্যামলী ও হারাকি ক্লাব মাঠে বসানো হয়েছে কাঁচাবাজার। মিরপুরে হারুন মোল্লা ঈদগাহ আগে ছিল খেলার মাঠ, এখন সেটা দখল করে পাইকারি পণ্যের আড়ত হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। লালমাটিয়া বি ব্লকের নিউ কলোনি মাঠে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। খিলগাঁও জোড়পুকুর ভরাট করে মাঠ করা হয়েছে। এরকম আরও অনেক মাঠ দখল এবং মাঠের করুণ মৃত্যুর গল্প আছে শহরজুড়ে। প্রধানমন্ত্রীর ‘অনুশাসন’ আছে যে, রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে দুটি করে মাঠ থাকতে হবে। কিন্তু কাগজেকলমেও ঢাকার ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো মাঠ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শহরে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা দরকার। কিন্তু ঢাকা শহরে আছে এক বর্গমিটারেরও কম। তাছাড়া দুই সিটির খেলার মাঠ ২৩৫, বেদখল ১৯৩টি। তাহলে রক্ষক কি দিবাঘুমে মগ্ন!

রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের ২০২০ সালের জরিপ অনুযায়ী ঢাকায় খালের সংখ্যা ৭৩টি। এর মধ্যে ৩৭টিই দখলে। তাছাড়া ঢাকা ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীর চোখের সামনে মৃত্যু হলো। খাল ও নদীরক্ষায় সিটি করপোরেশনের কি কোনো দায় নেই? যারা মানুষের সুরক্ষায় নিরাপদ উৎসগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তারা কীভাবে এত মানুষের সেবার দায়িত্ব পালন করবে?

কাগজেকলমে সিটি করপোরেশনের জেনারেল হাসপাতাল, মাতৃসেবা কেন্দ্র থেকে হোমিও দাতব্য চিকিৎসাসেবা কার্যকর চালু আছে। কিন্তু কজন এসব সেবা পান? হোমিও দাতব্য সেবাকেন্দ্র কোথায়? এক হাজার নাগরিককে জিজ্ঞাসা করলে আমি নিশ্চিত, কেউ তা বলতে পারবেন না! তাহলে কেমন সেবা দেওয়া হচ্ছে? বিপুল অর্থ ব্যয়ে ব্যায়ামাগার, কমিউিনিটি সেন্টার নির্মাণ করলেও সেখান থেকে আয় কত? এর বাইরে বড় প্রশ্ন হলো কমিউনিটি সেন্টার থেকে কি করপোরেশন আয় চায়? আয়ের চেয়ে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এসির বাতাস খাওয়ার জন্যই অনেক সময় এসব সেন্টার কাজ করা হয়েছে।

অন্যান্য সেবা প্রতিষ্ঠানকে টাকার বিনিময়ে রাস্তা খননের অনুমতি দিলেও কাজ শেষে দিনের পর দিন সড়ক মেরামতের কোনো খবর থাকে না। বৈদ্যুতিক লাইট স্থাপন সিটি করপোরেশনের বড় কাজ হলেও নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে সবখানেই এই সেবার মান নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন। শহরে পার্কিং সুবিধা নেই, সড়কে গাড়ি পার্কিংয়ের ইজারা দিয়ে টাকা কামাচ্ছে সিটি করপোরেশন। অথচ রাস্তার পাশে বাণিজ্যিক ভবন হলো পার্কিং ছাড়া। রাস্তার পাশে গাড়ি রাখলেই জারিমানার মুখে পড়তে হচ্ছে! এটা কেমন নগর শাসন?

নাগরিক খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। যেখানে সেখানে খোলা খাবার তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে। ফুটপাতে মলমূত্র ত্যাগ হচ্ছে। ধুলা আর শব্দদূষণে বিষাক্ত নগর। ২৫ ভাগ সড়কের প্রয়োজন হলেও আছে আট ভাগ। ব্যবহার করা যাচ্ছে পাঁচ ভাগ। নিয়ম অনুযায়ী সড়ক সংস্কারের সময় ভাঙা অংশ তুলে ফেলার কথা। কিন্তু ভাঙা অংশের ওপরে আবারও ঢালাই করতে করতে শহরের অনেক বাড়ি গর্তে পরিণত হয়েছে। কে শুনবে অসহায় এসব বাড়ির মালিকদের কষ্টের গল্প?

একটি শহর এলাকায় ২০-২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা এবং ১০-১৫ শতাংশ জলাশয় থাকা উচিত; যা শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের সঙ্গে সঙ্গে পানি নিষ্কাশন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে সহায়তা করে। এর কোনোকিছুই নেই। প্রকট সমস্যা হলো নিরাপত্তার অভাব। শহরজুড়ে গিজগিজ করছে অপরাধী চক্র। নগর যেন হয়ে উঠেছে অপরাধীদের উর্বর ভূমি। সাংস্কৃতিক বিকাশ কেন্দ্র নেই। বস্তিতে ঠাসা শহর। নিরসন করা যায়নি তারের জঞ্জাল। দখলের কারণে রাস্তা ও ফুটপাত ধরে হাঁটার সুযোগ নেই। অনুমোদন ছাড়াই হচ্ছে ভবন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শঙ্কিত করে তুলছে নাগরিক নিরাপত্তাকে। সেই সঙ্গে নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে সমন্বয়ের অভাব।

ভাবা যায় গোটা রাজধানীতে নামেমাত্র এসি বাস সেবা আছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। বাস ভাড়ার ক্ষেত্রে অরাজকতা চলছেই। চালকের অবস্থা, বাসের বডি ও ভিতরের নাজুক চিত্র দেখলে বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে না। বিশ্বের মধ্যে অন্যতম এই শহরের যে কোনো প্রান্তে বাস থামিয়ে ওঠানামা করা যায়! উধাও হয়ে গেছে নগরে ট্যাক্সিসেবা। তাহলে মধ্যবিত্ত কীভাবে যাতায়াত করবে? অনুমোদনহীন যানবাহনে ছেয়ে গেছে গোটা শহর। ২৩ লাখ ৪২ হাজার যানবাহন এই শহরে এখন অনুমতি নিয়ে চলছে। এর মধ্যে গণপরিবহন কত? কেউ জানে না। এই হিসাবের বাইরে আরও কত লাখ যানবাহন চলছে, এই হিসাব কারও কাছে নেই। অথচ বিআরটিএ রেজিস্ট্রেশন থামাচ্ছে না। নাগরিক সেবায় গণপরিবহন জরুরি এই উপলব্ধি বা যন্ত্রণা নগরপিতার কাজ করে বলে মনে হয় না। নগরকে অনিরাপদ করে তুলছে মশা। হারাম করে দিচ্ছে সবার ঘুম। টিকাসংকট আর মশার উৎপাত নাগরিকদের মহাসংকটের মুখে ফেলেছে।

মানুষের নিঃশ্বাস ফেলার কোনো জায়গা নেই। পোলট্রি মুরগির মতো বড় হচ্ছে এই শহরের শিশুরা। তাদের ভবিষ্যৎ কী? পথে কেউ আইন মানছে না। যে যার মতো করে চলছে। এভাবেই চলতে থাকবে সবকিছু? এসবের কোনো প্রতিকার নেই?

সিটি করপোরেশনের কাছে চাওয়া কী? 

উন্নত নগর সেবায় পরিকল্পিত আবাসন, নিরবচ্ছিন্ন পানি ও বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, যানজটমুক্ত যোগাযোগ এবং ডিজিটাল সেবার (যেমন জন্মনিবন্ধন, ভূমি সেবা) সহজলভা থাকা অপরিহার্য। এ ছাড়া নিরাপদ পরিবেশ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণে নাগরিক কেন্দ্রিক সুবিধা নিশ্চিত করা একটি উন্নত শহরের প্রধান লক্ষ্য। এর সঙ্গে যোগ করা যায় সাংস্কৃতিক বিকাশ। এর সবকিছুতেই আমরা পিছিয়ে। মধ্যরাতে কারও বিপদ হলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত মিলছে না। উৎসব পালনে বাড়ি গেলে বাসাবাড়ি নিরাপদ থাকছে না। রোগী পরিবহনে সেবায় অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়। এটি ফ্রি হওয়া উচিত। এসব বিষয়ে এখন জরুরি ভাবনা ভাবতে হবে। নাগরিক সেবাকে প্রাধান্য দিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে গোটা নগরকে। নাগরিক সেবায় যেসব দেশ এগিয়ে তাদের ফলো করতে হবে। আশা করি নগরপিতার ঘুম ভাঙবে। সেবা না বাড়িয়ে বাণিজ্যে সিটি করপোরেশন! এই বদনাম থেকে বেরিয়ে আসবে। নগরপিতার দিবাঘুম ভাঙলে নিরাপদ থাকবে নগরবাসী। একটি কথা মনে রাখতে হবে, নগর অসুখী হলে নগরবাসী সুখী হতে পারে না।