Image description

পারিশা হক চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুলের পাশাপাশি তাকে যেতে হয় দু’টি কোচিংয়ে। পারিশার দাদা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। সারা জীবন শিক্ষকতা করানোর পরও চতুর্থ শ্রেণির নাতনিকে পড়াতে পারছেন না কেন? জানতে চাইলে তার মা বলেন, আমরা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত নিজেরাই পড়িয়েছি। কিন্তু শিক্ষকরা ক্লাসে যা পড়ান তা পরীক্ষায় আসে না। কিন্তু যারা স্যারদের কাছে কোচিং করে তারা ঠিকই পারে। শুধু তাই নয় কোচিং না করলে ক্লাসেও নানা ধরনের অপদস্থ করা হয়।
ছোট্ট ঋদ্ম। সবে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। ছুটে বেড়ানোর বয়সে একটা দিন ছুটিও পায় না। সময় মেলে না ছাদেও যাওয়ারও। তার কাঁধে বিশাল ব্যাগ। করতে হয় স্কুল, পাঁচটা কোচিং।

শুধু কী তাই; অনলাইনে আর্ট শেখার পাশাপাশি শিখছে আরবিও। শুক্র-শনি স্কুল বন্ধ, এই দুই দিনে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির জন্য করতে হয় তিনটি কোচিং। আর দুটি কোচিং একাডেমিক। ঋদ্মর দিন শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টায় আর শেষ হয় সন্ধ্যা ৬টায়। এরপরও রক্ষা নাই, বাড়িতে এসে সারতে হয় হোমওয়ার্ক। ঋদ্ম মোহাম্মদপুরের প্রিপারেটরি স্কুলের ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী। তার পেছনে পাঁচটি কোচিংয়ে গুনতে হয় ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। আর্ট শেখার জন্য মাসে ১২০০ আর আরবির জন্য ২৫০০ টাকা। স্কুলের বেতন তো আছেই।

ঋদ্মর বাবা বলেন, আমরা অসহায়। আমাদের ইচ্ছা ছেলেকে রেসিডেনশিয়ালে দেবো। সবাই বলাবলি করছে এসব কোচিংয়ে দিলে বাচ্চা ভর্তির সুযোগ পাবে। আর একাডেমিক কোচিংয়ের বিষয়ে বলেন, ঋদ্মকে তো দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভালো করতে হবে। রেসিডেনশিয়ালে চান্স না পেলে এখানেই পড়বে। ভালো রেজাল্ট না করলে পিছিয়ে যাবে। এজন্য স্যারদের কথামতো দুটা কোচিংয়ে দেয়া।

মনিপুর স্কুলের শিক্ষার্থী আয়মান ইসলাম। তার বিষয়ভিত্তিক চারটিসহ পাঁচটি কোচিংয়ে যেতে হয়। অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর মতে, কোচিং না করলে পাসই করতে পারবে না। ক্লাসে পড়ানো হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, নামকাওয়াস্তেই চলে ক্লাসের কার্যক্রম।

এই হলো ঢাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের হালচাল। তাদের নিয়ে রীতিমতো পেরেশান বাবা-মা। রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে কোচিং এর বাইরে খুব একটা শিক্ষার্থী নেই। এই কোচিংই জিম্মি শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক। কোচিং ব্যবস্থার কারণে লাটে ওঠার অবস্থা নামি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম।

রাজধানীর স্বনামধন্য ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের একজন শিক্ষকের দৈনিক রুটিন সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, বেলা ১২টার দিকে তিনি স্কুলে যান। থাকেন প্রতিষ্ঠানের পাশেই। সকাল সাতটা থেকে কোচিং শুরু করেন। স্কুলের আগ পর্যন্ত চলে কোচিং। আবার ৬টা থেকে শুরু হয় কোচিং যা চলে রাত আটটা পর্যন্ত। তিনি জোরপূর্বক শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।

সরজমিন মনিপুর স্কুলের ৬০ ফিট এলাকায় প্রায় এক রোডেই ২০ থেকে ২৫টি কোচিং সেন্টার দেখা মেলে। সেখানে এই স্কুলের শিক্ষকরা ব্যাচ করে বিষয়ভিত্তিক বিষয়ে পড়ান। ইকবাল হোসেন গণিতের টিউশনি করাচ্ছিলেন। ক্লাসে ছিল ১৮ জন শিক্ষার্থী। প্রতি শিক্ষার্থীর কাছে তিনি ১৫০০ করে টাকা নেন। এই শিক্ষক আটটি ব্যাচ পড়ান। প্রতিটি ক্লাসে গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী। এখান থেকে তিনি প্রায় তিন লাখ টাকা আয় করেন। এর বাইরেও রয়েছে স্কুলের বেতন ও চারটি ব্যক্তিগত টিউশনি।

একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক হিসেবে কথা হয় অর্কিড কোচিং সেন্টারে। সেখানে থাকা মাসুদ নামে একজন বলেন, এখানে মূলত মনিপুর স্কুলের শিক্ষার্থীরাই পড়ে। এই স্কুলের স্যারদের মাধ্যমেই পড়ানো হয়। তিনি নিশ্চয়তা দেন এখানে কোচিং করলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় কমন পাবেই। কারণ এখানে স্যাররাই কোচিং করান এবং তারাই প্রশ্ন করেন। শিক্ষক ইকবাল হোসেন বলেন, স্কুলে তো বাচ্চাদের ঠিকমতো পাড়ানো যায় না। এত বাচ্চা থাকে। আবার নানা ধরনের ছুটি।
কীভাবে চাপ দেয়া হয় কোচিংয়ের জন্য? এই প্রশ্নের জবাবে ভিকারুননিসায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী মাইশা হোসেনের মা বলেন, এখানে পরিবেশটাই সৃষ্টি করা হয়েছে কোচিংনির্ভর। বিষয়ভিত্তিক বিষয়ে কারা ভালো শিক্ষক এটা আগে থেকেই খোঁজ নিতে হয়। এটা একটা অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এমনকি তার ভাষ্য অনুযায়ী কোচিং করে না এমন শিক্ষার্থী পাওয়া দুষ্কর।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের চারটি শাখার আশপাশেই রয়েছে তিন শতাধিক কোচিং সেন্টার ও ব্যাচভিত্তিক প্রাইভেট পড়ানোর ব্যবস্থা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষকই স্কুলের বাইরে নিজেদের কোচিং বা ব্যাচে শিক্ষার্থীদের পড়ান। আবার লটারি পদ্ধতি বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষায় ফেরায় কোচিং বাণিজ্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠারও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১২ সালের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে না পারলেও বাস্তবে সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। অনেক শিক্ষক সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যাচভিত্তিক কোচিং করিয়ে বেতনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি আয় করছেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে নীতিমালা প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। হাইকোর্টের আদেশে ২০১৯ সালে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক ১০ শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারেন। ওই শিক্ষার্থীদের নাম, রোল ও শ্রেণি সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে জানাতে হবে। এ নীতিমালা ঢাকাসহ দেশের কোথাও মানা হচ্ছে না। নীতিমালা শুধু কাগজ-কলমে আছে। কোচিং-বাণিজ্য বন্ধে তদারকি করতে মেট্রোপলিটন ও বিভাগীয় এলাকার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি করে ৯ সদস্যের কমিটি থাকার কথা। জেলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং উপজেলার ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে আট সদস্যের কমিটি গঠনের কথা নীতিমালায় বলা হয়েছে। বাস্তবে এসব কমিটির কার্যকারিতা নাই।

সম্প্রতি কোচিং বাণিজ্য নির্মূল করতে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান শক্ত। শুধু বৃত্তি না, সার্বিকভাবে কোচিং আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে। এটি একটি বড় সমস্যা। কোচিং নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বেশ কিছু ইনোভেশন বা পলিসি চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে খুব শিগগিরই পাইলটিং শুরু হবে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, দেশে-বিদেশে সবকিছুর লাইসেন্স ব্যবস্থা আছে। কিন্তু, ব্যাঙের ছাতার মতো কোচিং সেন্টার- এগুলোও আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই চিহ্নিত করতে হবে কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে দুর্বল। সেভাবে শিক্ষকদের ব্যবস্থা নিতে হবে। এভাবে কোচিং সেন্টার শতভাগ বন্ধ করতে হবে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসম্মত করতে হবে। কোচিং সেন্টার যদি ছাত্র না পায়- কোচিং সেন্টার তৈরি হবে কেন?