এ এক আজব ঘটনা! দুইদিন ধরে হদিস মিলছে না সাবেক মেয়র ও শিল্পপতি এম মনজুর আলমের। না অফিস, না বাসা। মোবাইল বন্ধ। হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশও। সাংবাদিকরা তো আছেই। কেন তার খোঁজ পাচ্ছেন না— ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ধমকে তটস্থ মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাও।
তবে কি তিনি অপহরণের শিকার হয়েছেন? কেউ কি মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে? তাও না। ব্যাপারটা কী? মনজুর হঠাৎ কেন অজ্ঞাতবাসে?
এক মাস ধরে জোর আলোচনা, আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় ঘাটের পানি খাওয়া মনজুর জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিচ্ছেন। চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির আহ্বায়কের পদ প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কী করবেন না— এ রকম দ্বিধাদ্বন্দ্বে তিনি ও তার পরিবার। এনসিপি তাকে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী করবে, এমন গুঞ্জনে সয়লাব বন্দরনগরী।
আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে এনসিপি যখন চট্টগ্রামে যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করল, তার আগের দিন থেকেই খোঁজ মিলছে না মনজুরের। পরিবারের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠজনদের আপত্তিতে তিনি আপাতত এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন না— এমন তথ্য এর আগেই চাউর হয়েছে। এরপরও এনসিপি নেতারা হাল ছাড়ছেন না, এমন তথ্যও মিলেছে।
পরিবার ও এনসিপির টানাটানির মধ্যে শেষপর্যন্ত মনজুরের সিদ্ধান্ত কী, সেটা জানার আগ্রহ পুলিশের। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের চট্টগ্রামে সফরের বিষয়ে এনসিপির পক্ষ থেকে একের পর এক ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্য পুলিশের সেই কৌতূহলকে আরও তীব্র করে তোলে।
এমনই এক পরিস্থিতিতে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দেখা মেলে সিএমপির দুই কর্মকর্তার। উভয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ও মনজুরকে অনুসরণের (ওয়াচ) দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের কাছে তথ্য ছিল, এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ও আব্দুল হান্নান মাসউদ দুপুর ২টায় বিমানে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন।
ঢাকা থেকে রওনা হয়েছেন কি-না জানার জন্য এক পুলিশ কর্মকর্তা কল দেন কেন্দ্রীয় নেত্রী সাগুফতা বুশরা মিশমাকে। তিনি জানালেন, কেন্দ্রীয় নেতারা বিমানের পরিবর্তে সড়কপথে রওনা দিয়ে চট্টগ্রাম নগরীতে পৌঁছেছেন। আরেক বিপত্তি! চট্টগ্রাম শহরে কোথায় অবস্থান করছেন তারা, এমন অনুসন্ধানের মধ্যে তথ্য পৌঁছে তারা উত্তর কাট্টলীতে এম মনজুর আলমের বাসায় গেছেন।
অস্থির হয়ে পড়লেন, বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। নোয়াখালীর ভাষায় একজনকে মোবাইলে বলতে শোনা যায়, ‘কিয়ারে, তুই কোনাই? ঘুম যন্নি বেডা। তাআতায়ি মনজু সাবের বাসার হিয়ন্দি টিম ফাঠা।’ (কিরে তুই কোথায়, ঘুম যাচ্ছ বেটা। তাড়াতাড়ি মনজু সাহেবের বাসার ওইখানে টিম পাঠাও)
মিনিট বিশেক পর ফিরতি কলে জানতে পারলেন, আকবর শাহ থানা পুলিশের টিম ওই বাসায় গিয়ে জানতে পেরেছে ইনফরমেশন ভুল। মনজুর বাসাতেই নেই। ফের কল ওই পুলিশ কর্মকর্তার, ‘ভালা করি খবর লাগা বেডা। হেতে কোনাই গেছে আঁরে জানা। স্যারে হাডাই হালার।’ (ভালো করে খবর নে বেটা। তিনি কোথায় গেছেন আমাকে জানা। স্যার আমাকে ফাটাই ফেলছে।)
মনজুর কোথায়, এনসিপি নেতারা কোথায়? ‘স্যারের’ চাপে গলদঘর্ম অবস্থা দুই পুলিশ কর্মকর্তার। তথ্য আসে, মনজুর দুইদিন ধরে অফিসে যাচ্ছেন না। গতকাল সকাল থেকে বাসায়ও নেই। মনজুরের ঘনিষ্ঠ একজনকে কল দেন নোয়াখালীর ওই কর্মকর্তা, ‘ভাইরে ভাই, কসম কাই আঁরে এক্কানা কন দেহি, হেই বেডা কি এনসিপিতে জয়েন কৈত্তু ন নি ? হেতে কোনাই?’ (ভাইরে ভাই, কসম করে আমাকে একটু বলতো দেখি, ওনি কি এনসিপিতে যোগ দেবেন না? তিনি কোথায়?) গ্রহণযোগ্য কোনো উত্তর না পেয়ে রাগে গজগজ করতে থাকেন তিনি, ‘ওমা, হেতেও দেখি কাবিল অই গেছেগুই।’ (ওমা, সেও দেখি কাবিল হয়ে গেছে।)
এরপর আবার তথ্য আসে, মোটেল সৈকতে ঢাকা থেকে আসা এনসিপি নেতারা অবস্থান করছেন। মনজুর সৈকতের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। আবার বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন দুই কর্মকর্তা। মোবাইল কানের কাছ থেকে যেন আর সরছে না, ‘ভাইরে ভাই, সকালে হোটেলত্তুন রেজিস্ট্রারের ছবি হিয়ান পাঠাইছেনি? তাড়াতাড়ি আঁর ওয়াটসঅ্যাপে দে, আল্লাহ ভরসা।’ (ভাইরে ভাই, সকালে হোটেল থেকে রেজিস্ট্রারের ছবিটা পাঠিয়েছে? তাড়াতাড়ি আমার হোয়াটসঅ্যাপে দাও, আল্লাহ ভরসা।)
দ্রুততার সাথে কোতোয়ালী থানার টিম পৌঁছে মোটেল সৈকতে। না, এবারও ইনফরমেশন ভুল। ইমতিয়াজ আলী নামে একজন এনসিপি নেতা কেন্দ্রীয় নেতাদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন, এমন তথ্য পান পুলিশ কর্মকর্তারা। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, কেন্দ্রীয় নেতারা বিমানেই আসছেন।
শেষপর্যন্ত মনজুরের অবস্থান আর জানতে পারেননি পুলিশ কর্মকর্তারা। বিমানবন্দর থেকে তথ্য আসে, ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ একা চট্টগ্রামে এসেছেন। এরপর আরও খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন নাহিদসহ অন্য নেতারা সড়কপথে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছেছেন দুপুর ২টার দিকে।
আর বিকেল ৪টার দিকে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলে মনজুরের অজ্ঞাতবাসের রহস্যের সমাপ্তি টানেন ছেলে সরওয়ার উল আলম। তার ভাষ্য, ‘বাবা বাসা-অফিস কোথাও নেই। নিরাপদ দূরত্বে আছেন। এখন এই বয়সে আর ঝামেলায় জড়াতে চান না। ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকের ঋণ, আমাদের অনুরোধ সবকিছু বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত।’
গত ১৪ এপ্রিল বিকেলে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ গিয়েছিলেন মনজুরের উত্তর কাট্টলীর বাসায়। সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়ে তিনি ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন। তারা মনজুরকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার বাসায় যাওয়ায় হাসনাতের সমালোচনা করেন।
এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে চট্টগ্রামের এনসিপি নেতারা জানান, মনজুরকে দলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক এবং পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী করার প্রস্তাব নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ গিয়েছিলেন।