Image description

রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তিন তলার বারান্দার মেঝেতে কান্নাকাটি করছে নয় মাসের শিশু আবদুল্লাহ। নাকে নল লাগানো। একটু পরপর হাত দিয়ে তা খুলে ফেলার চেষ্টা করছে। শিশুটির মা শিরিনা আকতার জানান, হামে আক্রান্ত হওয়ায় চারদিন আগে ভর্তি করেছি।

কিন্তু সিট খালি নেই। বাচ্চার প্রচণ্ড জ্বরের সঙ্গে কাশি। মুখে কিছুই নিচ্ছে না। শুধু কান্নাকাটি করছে। মেঝেতে থাকার কারণে বাচ্চার খুবই সমস্যা হচ্ছে, ঠাণ্ডা লাগছে। এখানে আসার আগে শিশু হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানেও সিট খালি ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে এখানে ভর্তি হয়েছি।

এই রোগীর পাশেই ভর্তি রয়েছে নিউমোনিয়া আক্রান্ত মিম নামে সাত বয়সি আরেক শিশু। শিশুটির মা আলেয়া বেগম জানান, মঙ্গলবার সকালে ভর্তি হয়েছি। এসব শিশু রোগীর শয্যার কয়েক হাত দূরেই রয়েছে ধনুষ্টংকার ওয়ার্ড। সেখানে শিশুসহ বয়স্করা ভর্তি রয়েছেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী হামের রোগীদের জন্য পৃথক বিশেষায়িত ইউনিট থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে নানা অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। একই ওয়ার্ডে হামে আক্রান্তদের পাশাপাশি জলবসন্ত বা চিকেন পক্স, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, জলাতঙ্ক, কালাজ্বর, এমনকি এইডসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডগুলোতে রোগীদের মধ্যে কোনো ধরনের সুরক্ষামূলক দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে না। নির্ধারিত শয্যা ছাড়াও বারান্দার মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছে অসংখ্য রোগী। এছাড়া হাসপাতালটির ভেতরে-বাইরে ময়লা-আবর্জনা নোংরা পরিবেশ। বারান্দার ছড়ানো-ছিটানো ভাতসহ কাদামাটি মাখা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। গ্রিলের বাইরে থেকে আসছে পচা গন্ধ। ওয়ার্ডের পাশে টয়লেটের গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা। সন্ধ্যা নামতেই ওয়ার্ডগুলোতে মশার ঝাঁক রোগীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে বহুগুণে। ফলে চিকিৎসক, রোগী ও স্বজন সবাইকে চলতে হচ্ছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্য দিয়ে।

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগÑ নিয়মিত পরিষ্কার না করায় হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে প্রচুর ময়লা-আবর্জনা আর সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শৌচাগারসহ আশপাশে ময়লা-পচা দুর্গন্ধে পরিবেশ এতটাই খারাপ যে, মিনিটখানেকও সেখানে টেকা কঠিন।

হাসপাতালে নিচতলা থেকে চতুর্থতলা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন ওয়ার্ড ও মেঝেতে ধুলার স্তর। চারদিকে ব্যবহৃত মাস্ক, টিস্যু, কাগজের টুকরা, ফলের খোসার ছড়াছড়ি। দেয়ালে থুতু, পানের পিকের দাগ। গোসলখানা, শৌচাগারগুলো নোংরা। শয্যার চাদরগুলো অপরিষ্কার ও নোংরা। সারাক্ষণই মশা-মাছির উপদ্রব।

হাসপাতালের চার তলায় শিশুকে নিয়ে ভর্তি হয়েছেন কেরানীগঞ্জের মাহদী হাসান। তার অভিযোগ, এখানে হাম, জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাম যেহেতু ছোঁয়াচে রোগ, তাই স্বাভাবিকভাবে অন্য শিশুরা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে নানা ধরনের দুর্ভোগে পড়ারও অভিযোগ করেন কেউ কেউ।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সংক্রামক হাসপাতালে মোট শয্যা রয়েছে ১০০টি। এর মধ্যে হামের রোগীর জন্য শয্যা বরাদ্দ ১৫টি। কিন্তু বর্তমানে হামে আক্রান্ত শিশু ভর্তি রয়েছে ৫১ জন। গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছেন মোট এক হাজার ৫৯৮ জন। আর নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২৮৬ জন। আর এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে মারা গেছে ৩৬ শিশু।

হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা জানায়, নির্ধারিত শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন দ্বিগুণ রোগী ভর্তি হচ্ছে। তাই শয্যা সংকটের কারণে মেঝেতে, বারান্দায় হামে আক্রান্তসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে এক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই অন্য রোগে সংক্রমিত হচ্ছেন। চিকিৎসা নিতে এসে আরো গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক আমার দেশকে বলেন, হামের প্রকোপ বৃদ্ধি এবং রোগীদের চাপ সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতালগুলোতে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। পৃথক হাম ইউনিট না থাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আবার হাসপাতালে পরিবেশ দূষিত হওয়ার কারণে জলবসন্ত, শ্বাসতন্ত্র, যক্ষ্মা, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য রোগে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি খুবই জরুরি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান আমার দেশকে বলেন, রোগীর চাপ খুব বেশি। প্রতিনিয়তই রোগী ভর্তি হচ্ছে। তাই হাসপাতালের মধ্যে হামের বিশেষায়িত ইউনিট করার ব্যবস্থা করা যায়নি। তবে আমরা সাধ্যমত রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। হাসপাতালে নোংরা পরিবেশের ব্যাপারে তিনি বলেন, এখানকার আশপাশে বস্তি এলাকা। তাই চেষ্টা করে ভালো পরিবেশ রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরো ৭ শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ২ জনের, বাকি ৫ জনের শরীরে হামের উপসর্গ ছিল। একই সময়ে নিশ্চিত হামে শনাক্ত হয়েছে ৩৭৩ জনের শরীরে। সন্দেহজনক হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এক হাজার ২৮১ জনের। তাতে মোট হামের রোগী পাওয়া গেল এক হাজার ৬৫৪ জন। এছাড়া গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ৫৬ জন এবং হামের লক্ষণ নিয়ে ২৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাতে সরকারি হিসেবে গত ৫২ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২৪। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।