Image description

ফেসবুকে পরিচয়। বন্ধুত্ব থেকে লামিয়া তাসমিয়া খুলনার ছেলে হাফিজ মোহাম্মদ আশরাফের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। দিনে দিনে রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আশরাফের সঙ্গে লামিয়া ঘনিষ্ঠ হন। ছদ্মনামের এই নারীর অভিযোগ, আশরাফ পড়ালেখাসহ সব মিথ্যা বলেছে। ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব লুটেছে। এখন নানাভাবে হয়রানি করছে। সামাজিক সম্মান, ক্যারিয়ার– সব কেড়ে নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন করে তুলেছেন সে।

রাজধানীর উত্তরা থানায় আশরাফের বিরুদ্ধে লামিয়া অভিযোগ দিয়েছেন। তাতে তিনি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি-ভিডিও ধারণ করে আশরাফ কীভাবে ব্ল্যাকমেইল করছে, বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

গত মার্চের ঘটনা। স্বনামধন্য একটি শোবিজ-কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায় থেকে সেরা পাঁচে ওঠেন লামিয়া। ফাইনাল রাউন্ডের কয়েকদিন আগে তিনি সামাজিক মাধ্যমে নিজের বিশেষ মুহূর্তের ছবি-ভিডিও দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন! লামিয়ার ভাষ্যে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আশরাফের সঙ্গে সম্পর্ক। নিজের জন্মদিনে ডেকে নিয়ে চেতনানাশক খাইয়ে ছবি-ভিডিও ধারণ করে। প্রতারণা বুঝতে পেরে সম্পর্ক থেকে বের হতে চেষ্টা করলে ছবি-ভিডিও সামনে আনে আশরাফ। ব্ল্যাকমেইল থেকে প্রকাশ্যে মারধর পর্যন্ত করেছে।

তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে থানায় অভিযোগ করে সম্পর্ক ভেঙে দিই। তারপরই সবকিছু অনলাইনে দেয় আশরাফ। নিজের যোগ্যতায় প্রতিযোগিতার ফাইনালে উঠলেও সব শেষ হয়ে গেল! ফাইনাল রাউন্ডের আগে কয়েকদিন ট্রমায় ছিলাম।

অনুসন্ধানে স্ট্রিমও টেলিগ্রামের বিভিন্ন চ্যানেলে লামিয়ার গোপন ছবি-ভিডিও পেয়েছে, যেগুলো চক্রের সদস্যরা বিক্রি করছে। পরে লামিয়া জানিয়েছেন, ছবি-ভিডিও সামনে আসার পর রাজধানীর ভাটারা থানা এবং খুলনা সদর থানায় মামলা-জিডি করেন। তবে আশরাফ কিংবা কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগের তদন্ত করছেন তারা। আসামি গ্রেপ্তারের আগে কোনো তথ্য দেওয়া সমীচীন হবে না।

ফেসবুক প্রচার, বেচাবিক্রি টেলিগ্রামে

ফেসবুকের পাবলিক গ্রুপ ‘দাম্পত্য কলহ ও সমাধান’। গত ২৮ এপ্রিল ২ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সদস্যের গ্রুপে এক নারী পরিচয় গোপন করে পোস্ট দেন, ‘প্লিজ হেল্প, বিয়ের ৫ বছর ৪ মাস চলছে। ১ বছরের একটা ছেলে আছে। গত রাতে হাজব্যান্ড অফিস থেকে এসে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাচ্চা খেতে চাইছিল না দেখে ওর বাবার ফোনটা বাবুকে দেব বলে নিয়েছিলাম। আমি নরমালি আমার হাজব্যান্ডকে নিজের থেকেও অনেক বেশি বিশ্বাস করতাম। কিন্তু মোবাইলে ঢুকে দেখি টেলিগ্রাম অ্যাপে সে আমার সাথে ইন্টিমেসির ভিডিও, পিক আর ছবি, যেগুলো সে আমার ঘুমন্ত অবস্থায় তুলতো—ওগুলো সেল করে টাকা রিসিভ করে।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমি একেবারে শকড। আমার হাত-পা নাড়ানোর মতো মানসিক শক্তিটাও এখন আর নাই। দেখলাম এক একটা ভিডিও করে, অনেক ভিডিও বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপে সেল করে রাখছে। এখন আমি কী করব?’

অনুসন্ধানে স্ট্রিম এমন অন্তত ২০টি টেলিগ্রাম চ্যানেল পেয়েছে। এসব চ্যানেলে বিক্রি হয় নারীর গোপন ছবি-ভিডিও। মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় কেনা যায় এসব চ্যানেলের সাবস্ক্রিপশন। ফেসবুক গ্রুপে চুম্বক অংশ প্রচার, পরে টেলিগ্রাম চ্যানেলে এনে এসব ছবি-ভিডিও দেদার বিক্রি করেন পর্নোগ্রাফি চক্রের সদস্যরা।

রাজধানীতে মাসে গড়ে ১৫ মামলা

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে শুধু রাজধানীতেই মাসে গড়ে ১৫টির বেশি মামলা হচ্ছে। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার বিভিন্ন থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে ১৪, ফেব্রুয়ারিতে ১২ ও মার্চে ১৬টি মামলা হয়েছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্যে, ২০২৫ সালে সিআইডির সাইবার সাপোর্ট সেন্টার পর্নোগ্রাফি, অন্যের গোপন ছবি-ভিডিও ফাঁস-সংক্রান্ত ৪৮০টি অভিযোগ গ্রহণ করে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এমন অভিযোগ এসেছে ২৩৭টি। অভিযোগের সঙ্গে জড়িত প্রায় সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি সিআইডির।

সংস্থার বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন খান স্ট্রিমকে বলেন, পর্নোগ্রাফি-সংক্রান্ত অভিযোগ আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করি। নতুন করে নেওয়া মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। প্রত্যেকটি মামলায় আসামি গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। বাকি মামলার আসামিরাও গ্রেপ্তার হবেন।

এক চ্যানেল বন্ধ তো চালু আরেকটি

সম্প্রতি ভোলা ও রাজধানী মিরপুর এলাকা থেকে পর্নোগ্রাফির অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর টেলিগ্রামের একটি চ্যানেলে ‘জরুরি ঘোষণা’ দেন অ্যাডমিন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমাদের এই চ্যানেলের অ্যাডমিনকে পুলিশ আটক করেছে। তার মোবাইলে টেলিগ্রামের মাধ্যমে আপত্তিকর (পর্নোগ্রাফি) কন্টেন্ট পাওয়ার কারণে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের আপত্তিকর কন্টেন্ট কেনাবেচার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে এবং বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারিতে রয়েছে। তাই সবাইকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে এ ধরনের টেকনিক্যাল ঝুঁকিপূর্ণ কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকুন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন। নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রোফাইল সেটিং থেকে গ্রুপ/চ্যানেল থেকে নিজেকে লিভ/আলাদা করে নিন। সবাই নিরাপদ থাকুন।’

অবশ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হলেও পর্নোগ্রাফি চক্র থেমে নেই। একটি চ্যানেল বন্ধ করলে, তারা আরেকটি খুলে কারবার চালাচ্ছেন। অনেক সময় নিজেরা সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রেখে, পরে আবার সেটি সক্রিয় করছেন। টেলিগ্রামের এমন অন্তত ২০টি চ্যানেল ঘেটে একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

সাবস্ক্রিপশন নেওয়া কয়েকটি প্রিমিয়াম চ্যানেল ঘুরে দেখা যায়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র টাকার বিনিময়ে নারীর ছবি-ভিডিও প্রচার করছে। একটি চ্যানেল বন্ধ করে দিলে বা পুলিশের নজরে আসলে তারা নতুন চ্যানেল চালু করে। সেই চ্যানেলে শুরু হয় নতুন-পুরাতন ছবি-ভিডিও বিক্রি। ফলে ফাঁস হওয়া ভিডিও ঘুরতে থাকে একটি থেকে আরেক চ্যানেলে।

সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সাইবার ইনভেস্টিগেশন) এনামুল হক স্ট্রিমকে বলেন, এমন ঘটনা অনেক সময় রাগ, ব্ল্যাকমেইল বা ইমোশনের কারণে ঘটে। অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও যথাযথ শাস্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করা গেলে এই ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। আমরা সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি রাখছি। নিয়মিত অভিযানে অনেককে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে।