Image description

ঋণ করে সৌদি আরব গিয়ে তিন মাসের মাথায় খালি হাতে বাড়ি ফিরে আত্মহত্যা করেছেন যশোরের মনিরামপুরের ৩৫ বছরের যুবক ফিরোজ হোসেন। তার মতো মাত্র ১৬ বছর বয়সে আত্মহনন ঘটিয়েছেন তৈয়বা জাহান চৈতি। ভোলা পৌরসভার এই কিশোরীর এসএসসির ইংরেজি পরীক্ষা আশানুরূপ হয়নি। চৈতির চেয়ে বয়সে কয়েক বছরের বড় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমো। তিনি একটি চিরকুটে ব্যক্তিগত বিষয় ও আর্থিক লেনদেনের ‘চাপ’ উল্লেখ কলে আত্মহত্যা করেছেন।

গত এক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া এই তিনটি ঘটনা ভিন্ন হলেও কারণ একটাই–কোনো না কোনো সংকট। এমন বহুমুখী সংকটে আত্মহননের মধ্যে মৃত্যুবরণ করতে চেয়ে ফিরে আসাদের অভিজ্ঞতা অবশ্য তিক্ত। তেমন একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার ৩৫ বছর বয়সি যুবক সামিউল ইসলাম আকাশ। গত বছর পারিবারিক কলহ ও ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। একপর্যায়ে আত্মহননের সিদ্ধান্ত নেন। বিষপান করার পর স্বজনরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পাকস্থলি পরিষ্কারের মাধ্যমে তার শরীর থেকে বিষ অপসারণ করেন চিকিৎসকরা।

সেই দুঃসহ স্মৃতি হাতড়ে আকাশ এশিয়া পোস্টকে জানান, নাক ও মুখ দিয়ে নল ঢুকিয়ে পাকস্থলী থেকে বিষ বের করার সেই প্রক্রিয়াটি ছিল অবর্ণনীয় যন্ত্রণার, যা তাকে নতুন করে জীবনের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে আকাশ সুস্থ আছেন এবং পরিবারের সাথে স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করছেন।

প্রতিদিন এক-দুইজনের আত্মহত্যার চেষ্টা
আকাশ জীবন ফিরে পেলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে–এই জনপদে প্রতিদিন গড়ে এক থেকে দুইজন মানুষ নিজের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়ার মতো চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন।

শুধুমাত্র ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ৬৮৮ জন এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৪৯ জনসহ গত ১৬ মাসে জেলায় মোট ৮৩৭ জন মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।

গাণিতিক হিসাবে জেলায় গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫২ জন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১০৮ জন এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

 

সমাধানের পথে আছে ঘাটতি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম্পত্য কলহ, অভাব-অনটন, বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক এবং প্রেমের সম্পর্কের বিচ্ছেদের মতো বহুমুখী আর্থ-সামাজিক সংকট মানুষকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসবের মধ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার অভাব। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেও জেলার সরকারি স্বাস্থ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নেই কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকিয়াট্রিস্ট। এজন্য সাধারণ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ বিষয়ে শাহ নেয়ামতুল্লাহ কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহীন কাউসার এশিয়া পোস্টকে বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। যখন কেউ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সে নিজেকে কোনো ঘটনার জন্য দায়ী মনে করে। সেখান থেকে নিষ্কৃতি পেতে এই ধরনের চরম পথ বেছে নেয়।

তিনি আরও জানান, একজন মানুষ আত্মহত্যা করার তিন থেকে ছয় মাস আগে থেকে কিছু বিশেষ লক্ষণ প্রকাশ পায়। পরিবার ও সমাজের মানুষের এই লক্ষণগুলো চেনার সক্ষমতা থাকলে অনেক অকাল মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব।

ঠিক একই অনুভূতি হয়েছে আত্মহত্যার চেষ্টা করা আকাশের। তিনি বলেন, বিষ খাওয়ার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পর আমার মনে হয়েছিল, কাজটা ঠিক হলো না। বাঁচার জন্য ছটফটানি যে কী ভয়াবহ, তা ওই সময় ছাড়া কেউ বুঝবে না। এখন বুঝি সমস্যা সমাধান করা যায়; কিন্তু জীবন গেলে তা আর ফেরে না। মনের দুঃখ কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারলে হয়তো ওইদিন আমি এই ভুলটা করতাম না।

প্রতিরোধে কাউন্সিলিংয়ের বিকল্প নেই
চাঁপাইনবাবগঞ্জে কর্মরত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার ডা. আশরুফুজ্জান শাহিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, জেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকলেও সরকার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসক ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এখন জেলার সবগুলো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিকভাবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সিলিং দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কেউ চাইলে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার শরণাপন্ন হতে পারেন, তিনি রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সন্ধান পেতে পথপ্রদর্শক হিসেবে সহায়তা করবেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ কে এম শাহাব উদ্দীন বলেন, সাধারণ মানুষ যদি সচেতন হয়ে মনের যত্ন নেয় এবং নিজের জীবনকে মূল্যায়ন করতে শেখে, তবেই এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতায় পারে বিষণ্ণতার চিত্র বদলে দিতে।