সিকিম থেকে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং-জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদী। এরপর নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীর ভেতর দিয়ে ১২৪ কিলোমিটার অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে এ নদী।
এক সময় বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলার মানুষের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত ছিল তিস্তা। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে সেই তিস্তা এখন এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখের কারণ।
গত ৩৮ বছরে শুষ্ক মৌসুমে সোয়া দুই কোটি কিউসেক পানি থেকে তিস্তাকে বঞ্চিত করেছে ভারত। এর ফলে গভীরতা কমেছে তিস্তার, জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। এতে হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য। বিশেষ করে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ থেকে ভাটিতে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত চোখে পড়ে নদীর এমন হতশ্রী চেহারা। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে দুই কূল উপচে তিস্তাপাড়ে দেখা দেয় বন্যা। চোখের সামনেই ভেসে যায় বসতভিটাসহ ঘরবাড়ি।
ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারে এ অঞ্চলের মানুষের বহুমুখী দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে তিস্তা। তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে এ অঞ্চলে কৃষিজমিতে যে সেচ দেওয়ার কথা, সেটাও এখন অস্তিত্বের সংকটে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কৃষি, মাছ, পরিবেশ ও নৌ-যোগাযোগ ক্ষেত্রে। এমনকি তিস্তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোয় নিম্নমুখী হচ্ছে পানির স্তর।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক গতি ঠিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজে প্রতিদিন পানির প্রয়োজন ৭ থেকে ১০ হাজার কিউসেক। সেখানে পানি পাওয়া যায় মাত্র ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ কিউসেক। প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম ধরা হলেও নভেম্বর থেকেই শুকিয়ে যায় নদী।
তিস্তা ব্যারাজের উজানে গজলডোবায় ১৯৮৭ সালে বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার শুরু করে ভারত। এতে তিস্তা অববাহিকায় নেমে আসে ঘোর অমানিশা। শুষ্ক মৌসুমের তিন মাসে পানির প্রয়োজন গড়ে সাত লাখ কিউসেকের বেশি। এভাবে গত ৩৮ বছরে পানি পাওয়ার কথা ছিল আড়াই কোটি কিউসেকের বেশি। মৌসুমে গড়ে এক হাজার কিউসেক করে ধরা হলে পানি পাওয়া গেছে ৩৪ লাখ কিউসেক। সেই হিসাবে সোয়া দুই কোটি কিউসেক পানি থেকে বঞ্চিত হয়েছে তিস্তাপাড়ের মানুষ।
আবার বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দিয়ে দুই কূল ভাসায় ভারত। এ সময় পানির প্রবাহ থাকে প্রায় এক লাখ কিউসেক। রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, এক হাজার কিউসেকের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে শুষ্ক মৌসুমে। তিস্তা ব্যারাজের সবগুলো গেট বন্ধ করে সেচ সুবিধা দিতে হচ্ছে। ফলে ভাটি এলাকায় নদীতে এক ফোঁটা পানি ছাড়ারও সুযোগ মেলে না। তবে নদীর গতিপথ ঠিক রাখতে ৭ থেকে ১০ হাজার কিউসেক পানির প্রয়োজন।
সরেজমিন দেখা যায়, তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে নদীর যতদূর চোখ যায়, শুধু বালু আর বালু। মাঝেমধ্যে পানির মৃদু ধারা। পানির অভাবে চলাচল করতে না পারায় বেঁধে রাখা হয়েছে নৌকাগুলো। অনেকে হেঁটেই পার হচ্ছেন নদী। ব্যারাজ এলাকায় পর্যটকদের নৌকায় ঘুরিয়ে প্রায় দুই দশক ধরে জীবিকা নির্বাহ করা বাইশপুকুর গ্রামের রইচ উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘এ্যালা নদীত পানি নাই, পর্যটকও আইসে না। হামার নৌকাও চলে না, সংসারও চলে না।’
পানির অভাবে তিস্তার ছোট-বড় শতাধিক খেয়াঘাট বন্ধসহ মারাত্মক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে নৌ-যোগাযোগে। রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়ায় তিস্তার বুক জুড়ে চাষ হয়েছে ভুট্টা, চিনাবাদাম, মিষ্টি কুমড়াসহ রকমারি ফসলের। গঙ্গাচড়ার মটুকপুর চর এলাকার কৃষকরা জানিয়েছেন, কয়েক বছর ধরে তিস্তার পলি পড়া চরে নানা ফসল ফলান তারা। নদীর পানিতে সেচ সুবিধা থাকায় কম হতো উৎপাদন খরচ। কিন্তু এখন নদী শুকিয়ে মরুভূমি হয়েছে। নদীর বুকে সেচযন্ত্র বসিয়ে চাষ করা ফসলে সেচ দিতে হচ্ছে। তিস্তাপাড়ের লক্ষ্মীটারি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলছিলেন, ‘তিস্তার বেহাল দশায় নানামুখী সমস্যায় পড়েছে নদীপাড়ের মানুষ। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গাছপালা মরে যাচ্ছে। মরুভূমিতে রূপ নিয়েছে পুরো চরাঞ্চল। বেকার হয়ে পড়েছেন মৎস্যজীবী ও মাঝিমাল্লারা।’
তিস্তার পানি নিয়ে জিআরসির মন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৫ সালে। এরপর ২০০৬ সালে বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও ভারত সরকারের আগ্রহ না থাকার কারণে হয়নি বৈঠকটি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বৈঠকের প্রক্রিয়া আবার শুরু হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
নদী গবেষক অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদের ভাষ্য, ‘বন্যা-ভাঙনসহ পানিহীন তিস্তার বহুরূপ দেখেছে এই অঞ্চলের কয়েক প্রজন্ম। তিস্তাপাড়ের মানুষের ছুটে চলার পথ শুধু বসতভিটা আর তিস্তায় জেগে ওঠা চরের কৃষিজমি। সে কারণে আগে তিস্তা নদীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’