'অখন্ড ভারত' পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই পশ্চিমবঙ্গে নজিরবিহীন নির্বাচনি জায়ালিতি মঞ্চস্থ হয়েছে বলে প্রতীয়মান। প্রায় ৩০ লক্ষ ভোটারকে বাংলাদেশী দেখিয়ে বাদ দেয়া হয়েছে। বাস্তবে দেখা গাছে ইনারা জন্মসূত্রেই ভারতীয়। বাদ গেছে নবাব ও শাসক পরিবারও। ৯২ শতাংশের মত ভোট পড়েছে, মানুষের চাকরি, কর্ম, অসুস্থতা, শ্রমজীবীদের জরুরি শ্রমের প্রয়োজন এবং স্বাভাবিক ট্রান্সপোর্টেশন ও মবিলিটি বিবেচনায় এত অধিক হারের কাস্টিং অসম্ভব। বাদ পড়া ভোটাদের মূলত বাংলাদেশী মুসলমান বলা হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে (Special Intensive Revision SIR-এর পর) বনগাঁ, রানাঘাট সহ বিভিন্ন মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় বহু মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের নামও বাদ পড়েছে। এমন নির্বাচনী জালিয়াতি অভাবিত।
কী বিপদ-
১। বাংলায় শাসক হিসেবে বিজেপির উত্থানে সার্বিকভাবে বাংলা ভাষা বিপদে পড়বে, হিন্দির উত্থান আগেই ছিল। হিন্দি এখন বাংলা ভাষাকে একেবারে কোনঠাসা করে দিবে।
২। বাংলা ভাষার চাকরি আরও একদফা সংকুচিত হবে। হিন্দিভাষীদের চাকরি অনেক বেড়ে যাবে।
৩। গুজরাটি সহ হিন্দী ভাষাভাষীরা বাংলার অর্থনীতির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিবে।
পাশপাশি,
৪। বাঙ্গালী সংস্কৃতির বিপদও হবে।
৫। মধ্যপন্থী ও উদারবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চিন্তার স্পেইস, মত প্রকাশের স্পেইস এবং সিভিল সোসাইটি সংকুচিত হবে।
৬। সবশেষে, 'অখন্ড ভারত' পরিকল্পনায় মুসলমানদের উপর বাংলাদেশী বলে হামলা হবে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে। মুসলমানদের রিফ্যুজি বলে দীর্ঘ সীমান্তের এখানে সেখানে পুশ ইন করার চেষ্টা করবে বিজেপি।
৭। সীমান্ত বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভিসা, পুশইন ইত্যাদিতে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে , সীমান্ত হত্যাও বাড়তে পারে। সার্বিকভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি কমে যাবে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের ২২টির মত সচল স্থলবন্দরের অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গের সাথে। ফলে ওপার বাংলার ব্যবসায়ীরা, সংশ্লিষ্টরা, শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এই বিপদ বাংলাদেশেরও। এমনিতেই হাসিনাকে আশ্রয় এবং ১৭ বছরে বাংলাদেশে অবৈধ শাসককে প্রটেকশন দেয়া, বাংলাদেশের মানূষের ভোটাধিকার হরণে সাপোর্টের মত বিষয়ে, ক্রমাগত সীমান্ত হত্যায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের মানুষের মনকষাকষি আছে। পুশ ইনের মাধ্যমে নতুনকরে সীমান্ত উত্তেজনা তৈরি করে, বাংলাদেশে জঙ্গি নাটক মঞ্চস্থ করে এখানে হামলার বৈধতা উতপাদনের চেষ্টা চলতে পারে। পুশ ইন নতুন ডিপ্লোম্যাসির রাস্তা খুঁজতে বাধ্য করবে। তিস্তা নিয়ে অতীতে মমতাকে দোষারোপ করা হয়েছিল এককভাবে। অথচ, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র বেসিনকে 'ওয়াটার সারপ্লাস জোন' বলে মধ্য ভারতের 'ওয়াটার স্কারসিটি জোনে' পানি প্রত্যাহার করা ভারত সরকারেরই কেন্দ্রীয় এজেন্ডা ছিল। ফলে পানি হিস্যা, গঙ্গা পানি চুক্তি, তিস্তা চুক্তি নতুন অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে।
দুই
ষাটের দশক থেকে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের চিন্তক বুদ্ধিজীবী সমাজ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নামে যে বাঙ্গালী রেনেসাঁর চেষ্টা করেছে, তা এসব হঠকারী বদ্ধিজীবীদের জ্ঞাতে এবং অজ্ঞাতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে প্রমোট করেছে। আজকে কলকাতায় বাংলার মানুষের মধ্যপন্থী রাজনীতির পতন মূলত বাংলা ভাষা, বাঙ্গালী সংস্ক্রিতির পতনকেই তরান্বিত করবে। ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশেও হাসিনা ও আওয়ামীলীগ রবীন্দ্রনাথ ও বাঙ্গালী সংস্ক্রিতিকে স্বৈরসাশন ও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার টূল হিসেবে ব্যবহার করেছে। কবিতার বাইরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে রাজনীতি ও সার্বিক সংস্ক্রিতিতে প্রমোট করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেহেতু ভারতীয় জাতীয়তাবাদেরই ধারক, ফলে দিনশেষে বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পতনের সাথে রাজনীতির পতনও অবধারিত ছিল কিনা সেটা অনেকেই টানছেন। বাস্তবে যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে ৫২র ভাষা আন্দোলন হলো, বাংলাদেশ হলো, পশ্চিম বাংলার ভাগ্য সেদিকেই হেলছে। সংস্কৃতি, ভাষা, রাজনীতি এবং অর্থনিতিতে কালেক্টিভলি স্বাধিকার বঞ্চিত মানুষের শেষ ঠিকানা বিপ্লব ও স্বাধীনতা। বাঙ্গালির সিভিলাইজেশনের মুকুট যদি কলকাতা হয়, তাইলে তা দল্লীর কলোনী হতে পারে না। ঢাকা বাঙ্গালির রাষ্ট্রসাধনার সফল উদাহরণ, ফলে কলকাতাকে অন্তত নিজের ভাষা সংস্কৃতি সহ নিজের লোকেদের কর্ম বাঁচাতে স্বাধীকারের পথে সজাগ থাকতে হবে।
সবমিলে, আজকে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের নতুন উপলক্ষ তৈরি হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা, আমরা কলকাতার পাশে কীভাবে দাঁড়াবো তাঁর জন্য দুই বাংলার বিজ্ঞজনদের মধ্যে ডায়ালগ হওয়া চাই। এটা রাজনৈতিক ডিরেকশনে আগাবে না। এর জন্য বাংলাদেশের নেতাদেরও দায় আছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরা দিল্লার কদর যতটা করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের সাথে সেভাবে সম্পর্ক রাখেননি। হয়ত দিল্লির ভয়ে পারেননি। তথাপি ভাষা ও সংস্ক্রিতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ডায়ালগ দরকার আমাদের।
শত শত বছর ধরে বাংলার সীমানার শুধু পরিবর্তনই হয়েছে। তাই ভয়টা বেশি ই পাই। এটা আফসুস যে, যেখানে দুই বাংলার কোটি কোটি বাংগালির জীবনমান উন্নয়ন, উন্নত কর্মসংস্থান আমাদের রাজনীতির মূল উপজীব্য হবার কথা ছিল, যেখানে এখনও দুই বাংলায় অন্তত ৫ কোটি মানুষ দরিদ্র সীমার নিচে বাস করেন স্থায়ীভাবে, সেখানে পূর্বে ৭১ এবং পশ্চিমে মুসলমান নাগরিকত্ব বিতর্কে আমাদের বাদবাকি সবকিছু ভুলিয়ে দেয়ার রাজনীতি হয়েছে।
আমাদের বুদ্ধিজীব্দের জীবনকালে পূর্ব বাংলায় ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়। পশ্চিমে তাদের জীবদ্দশাতেই বাঙ্গালীর রাজনীতি পরাজিত হয়ে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অখন্ড ভারত প্রকল্প বেগবান হয়।
অন্য অনেক বিষয়ের মতই পশ্চিমবঙ্গের বিপদে আমরা দুই দিকের কেউই তেমন প্রস্তুত ছিলাম না।
আসুন কথা বলি, পাশে দাঁড়াই।
বেটার লেট দেন নেভার!