গত ১ মে পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধান সমন্বয়ক মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এক জনসভায় রাখা বক্তব্যে দাবি করেন, প্রথম মে দিবস পালন করেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বক্তব্যটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি তে প্রচারিত হয়। শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজেও ভিডিওটি পাওয়া যায়।
ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “সারা দুনিয়াতে আজকে এই দিবস পালিত হচ্ছে— ভাগ্যহত মেহনতি মানুষের জাগরণের দিন। এই দিন প্রথম পালন করেছিলেন ১৯৭৯ সালে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।“
দেখুন এখানে।
দ্য ডিসেন্টের যাচাই এ দেখা যায়, দাবিটি সত্য নয়। জিয়াউর রহমান নয়, ১৯৭২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে প্রথম মে দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করেন।
প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে ১৯৭২ সালের ৩ মে প্রকাশিত সংবাদপত্র ইত্তেফাক ও দৈনিক বাংলা পত্রিকায় স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম মে দিবস পালনের তথ্য পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে প্রথম মে দিবস পালিত হয়। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে লেখা হয়, “বিশ্বের মেহনতী মানুষের সহিত একাত্মতা ঘোষণা এবং পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ, জোতদার এবং ইহাদের জনক সাম্রাজ্যবাদের সকল চক্রান্ত ব্যর্থ করিয়া দিয়া বঙ্গবন্ধুর সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কর্মসূচী সফল করিয়া তোলার অগ্নিশপথ গ্রহণের মাধ্যমে গত সোমবার গণপ্রজাতন্ত্রী স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার রাজধানীসহ সারা দেশে ঐতিহাসিক মে দিবস পালিত হয়।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “ঢাকায় এই দিন বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক লীগ ট্রেড ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ প্রেস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংস্থার পক্ষ হইতে গৃহীত কর্মসূচী অনুযায়ী মে দিবস উদ্যাপন করা হয়। মুক্ত বাংলাদেশে মে দিবস এবার মেহনতী মানুষের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যময় এবং অর্থবহ হইয়া উঠে। এই দিন মেহনতী শ্রমিক-কৃষকরাজ প্রতিষ্ঠার এক বলিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি ঘোষিত হয়। এইবারই প্রথম মেহনতী মানুষের অধিকার-সচেতনতার স্মৃতি বিজড়িত দিনটির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়।”
এছাড়াও, ১৯৭২ সালের ২ মে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে মে দিবস উপলক্ষ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ভাষণ নিয়ে তথ্য পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, মহান মে দিবসের ইতিহাসের সূচনা ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকদের ঐতিহাসিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হলে তারা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে সংগঠিত হয়ে ওঠে। ওই বছরের পহেলা মে দেশজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ শুরু হয়, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিকাগো।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৪ মে সংঘটিত হে মার্কেট বোমা বিস্ফোরণ ও পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। পরবর্তীতে, কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে বিতর্কিত বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে, তা বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের জন্ম দেয় এবং শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরপর ১৮৮৯ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে পহেলা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই থেকে দিনটি বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকার ও ন্যায্যতার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।