দুই দফায় অনুষ্ঠিত হওয়া পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হবে সোমবার (৪ মে)। ২৯৪টি আসনে ভোটগ্রহণ হলেও ফল পাওয়া যাবে ২৯৩টি আসনের। দক্ষিণ ২৪ পরগণার জেলার ফলতা আসনে অনিয়ম হওয়ায় এই আসনের ভোটগ্রহণ সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়। আসনটিতে আগামী ২৯ মে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে ৪ মে সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে ভোট গণনা। প্রথমে পোস্টাল ব্যালট এবং তারপর ইভিএমের গণনা হবে। আশা করা হচ্ছে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার মধ্যে ফল জানা যাবে।
জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন ভোটগণনা অবাধ ও স্বচ্ছ রাখতে ব্যাপক বন্দোবস্ত করেছে। প্রতিটি গণনাকেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে জারি করা হয়েছে বিধিনিষেধ। সিসিটিভি ক্যামেরা ও ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি রাখা হচ্ছে। গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তায় ত্রি-স্তরীয় ব্যবস্থা রয়েছে। তৎপর রয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ। শুধুমাত্র কিউআর কোডভিত্তিক পরিচয়পত্র থাকলে তবেই গণনা কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি মিলবে। কাউন্টিং অবসার্ভার ও রিটার্নিং অফিসার ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন না।
তবে অন্যান্য বারের তুলনায় এবার কমানো হয়েছে ভোট গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ভোটগণনা হয়েছিল ৯০টি কেন্দ্রে। ২০২১ সালের নির্বাচনে গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয় ১০৮টি। তবে এবার ভোট গণনা করা হচ্ছে কলকাতাসহ রাজ্যের ৭৭টি গণনাকেন্দ্রে। এর মধ্যে কলকাতায় রয়েছে পাঁচটি। কলকাতার সবচেয়ে বড় গণনাকেন্দ্র হচ্ছে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র। এখানে কলকাতার ১১টি বিধানসভা আসনের সাতটি আসনের ভোট গণনা হবে।
সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ রাখতে নির্বাচন কমিশন ৪৩২ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। এ ছাড়াও ১৬৫ জন অতিরিক্ত গণনা পর্যবেক্ষক এবং ৭৭ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। উত্তর ২৪ পরগনায় ৩৩টি আসনে ৪৯ জন গণনা পর্যবেক্ষক রয়েছেন। রাজ্যে সেটাই সর্বাধিক। সবচেয়ে কম আলিপুরদুয়ারে। সেখানে পাঁচটি আসনে ছয়জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে।
যদিও রাজ্যের এই স্ট্রং রুম নিয়ে তৃণমূলের সন্দেহ ঘোচাতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। তৃণমূল এখনও মনে করছে, বিজেপি নির্বাচন কমিশনের সহযোগিতায় স্ট্রং রুমে ঢুকে ইভিএম মেশিনে কারচুপি করে ফলাফল বদলে দিতে পারে। তাই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কড়া ভাষায় এই স্ট্রং রুম পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীদের। বলেছেন, ৪ মে ভোর পর্যন্ত কড়া নজরে রাখতে হবে সব স্ট্রং রুম।
মুখ্যমন্ত্রী মমতাও শুক্রবার রাতে ৪ ঘণ্টা অবস্থান করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল কেন্দ্রের স্ট্রং রুমে। এখানে মমতা টানা ৪ ঘণ্টা অবস্থা করে গভীর রাতে ফিরে যান। কর্মীদের বলে যান, ওরা ইভিএম কারচুপি করতে পারে। সজাগ থাকতে হবে কর্মীদের। পাহারা দিতে হবে। ওদের ইভিএম বদলিয়ে ভোটের অংক বদলানোর কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।
রাজ্যের দুই দফায় নেওয়া ভোটগ্রহণে রেকর্ড ৯৩ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। সোমবার সকাল হতেই বোঝা যাবে ক্ষমতার রাস থাকবে কার হাতে। আটটায় শুরু হবে ভোটগণনা। আর প্রথমেই হবে পোস্টাল ব্যালট গোনা। পোস্টাল ব্যালট গোনা শেষ হলে ইভিএমে ভোটগণনা শুরু হয়ে যাবে। মোটামুটি ৪ ঘণ্টার মতো সময় লাগতে পারে আর্লি ট্রেন্ড বুঝতে বুঝতে। কারণ, মোটামুটি ৪ ঘণ্টার মধ্যেই কয়েক দফার রাউন্ড গোনা শেষ হয়ে যায়। তাই এটা ধরা যায় যে মোটামুটি ১২টা নাগাদ একটু একটু করে পরিষ্কার হতে থাকবে ভোটের ফলাফল।
যদিও তখনই চূড়ান্ত ফলাফল কোন দিকে যাবে, সেটা বলা যায় না। কারণ, ভোটগণনা চলে একাধিক রাউন্ডে। কোনও একটি বিধানসভা কেন্দ্রে একটি নির্দিষ্ট রাউন্ডে কোনও একটি দলের প্রার্থী এগিয়ে থাকতেই পারেন। আবার পরের রাউন্ডেই তিনি হয়তো পিছিয়ে যেতে পারেন। উঠে আসতে পারেন অন্য কোনো প্রার্থী। তাই ১২টা পর্যন্ত দেখেই সবটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বরং সেই ফলাফল পেতে পেতে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে।
বুথফেরত সমীক্ষার বড় অংশই ইঙ্গিত দিচ্ছে, রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল হতে পারে এবং বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৪৮ আসন। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, কোনও দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও পেতে পারে। সেক্ষেত্রে জোট সরকারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি একই দিনে আসাম, তামিলনাড়ু, কেরালা ও পুদুচেরিতেও ফল প্রকাশিত হবে। অধিকাংশ বুথফেরত সমীক্ষাই কেরালায় সরকার বদলের ইঙ্গিত দিয়েছে। আসাম, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতে ক্ষমতাসীন জোটের প্রত্যাবর্তনের বার্তা দেওয়া হয়েছে সমীক্ষায়। বিশেষ করে তামিলনাড়ুর ফলাফল নিয়েও যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে, সেখানে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিন নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবেন কি না, নতুন শক্তি হিসেবে অভিনেতা বিজয় থালাপতির দল উঠে আসবে, সেটাও দেখার বিষয়।