ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় দেশের হাওড়াঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যায়ও নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে চলা পাঁচটি নদীর পানি বিপৎসীমার ২৫ থেকে ৯৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে হাওড়ের একমাত্র ফসল বোরো ধান। কৃষকের পাঁচ মাসের কষ্টের ফসল শেষ হয়ে গেছে মাত্র চার দিনের বন্যায়।
আগামী দুই দিনও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যায় নেত্রকোনার কলমাকান্দা স্টেশনে সোমেশ্বরীর পানি বিপৎসীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। একই জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ভুগাই-কংস নদী জারিয়া-ঝাঞ্ঝাইল স্টেশনে বিপৎসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার, মগরা নদী নেত্রকোনা স্টেশনে ৮০ সেন্টিমিটার ও আটপাড়া স্টেশনে ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। হবিগঞ্জের সুতাং নদী সুতাং-রেলওয়ে ব্রিজ স্টেশনে ৪৮ সেন্টিমিটার ও সুনামগঞ্জের নালজুর নদী জগন্নাথপুর স্টেশনে ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আগামী দুই দিনে সিলেট ও সুমানগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলা দুটির নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া হবিগঞ্জের খোয়াই, সুতাং এবং মৌলভীবাজারের মনু ও জুড়ি নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ও নতুন নতুন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এদিকে বন্যায় হাওড়াঞ্চলের কৃষক চরম বিপদে পড়েছেন। ডিসেম্বর থেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বড় করা বোরো ফসল ঘরে তোলার সময়ে আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে গেছে। কোমরসমান পানিতে নেমে ফসল কাটার চেষ্টা করছেন কৃষক। আবার যারা কিছু ফসল কেটে তুলতে পারছেন, বৃষ্টির কারণে তা শুকানো যাচ্ছে না। ফলে এবারের এই আকস্মিক বন্যায় অসংখ্য কৃষকের পথে বসার অবস্থা হয়েছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলাতেই প্রায় ৫০০ হেক্টরের বোরো ফসল এবং প্রায় ৫০ হেক্টরের মতো সবজি খেত সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সদ্যবিদায়ি এপ্রিল মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ জানান, সাধারণত এ সময়ের বৃষ্টি দুই থেকে চার দিন স্থায়ী হয়, কিন্তু এবার তা প্রায় আট থেকে ১০ দিন স্থায়ী হতে যাচ্ছে।
উজানের ঢলে বাড়ছে তিস্তার পানি তলিয়ে গেছে চরের ফসল : কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তা নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তিস্তার চরের অনেক ফসল ডুবে গেছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর লালমনিরহাটের উপপরিচালক সাইফুল আরেফিন বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার তিস্তার চরের প্রায় ২০০ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল তলিয়ে গেছে। তবে এতে তেমন ক্ষতি হবে না। কারণ, তিস্তার পানি খুব দ্রুত নেমে যায়। গতকাল সকাল ৯টায় লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহ বিপৎসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া কন্ট্রোল রুম ইনচার্জ নুরুল ইসলাম জানান, গতকাল ভোর থেকে পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। সকাল ৯টায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখনো বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে চরের কিছু জমির ফসল তলিয়ে গেছে।
হাওড়ের সমস্যা স্থায়ী সমাধানে সাত দাবি : হাওড়ের জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ, অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সাত দফা দাবি জানিয়েছে ঢাকায় হাওড় অঞ্চলবাসী। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে এ দাবি জানানো হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন-হাওড় অঞ্চলবাসীর প্রধান সমন্বয়ক ড. হালিম দাদ খান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব গোলাম শফিক, অধ্যাপক ডা. শাহীন রেজা চৌধুরী, পরিবেশ ও হাওড় উন্নয়ন সংস্কারের সভাপতি কাশমির রেজা প্রমুখ। দাবিগুলো হলো-হাওড়ের জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের বছরব্যাপী খাদ্য সহায়তা দেওয়া, হাওড়ে ব্যাপক ভিত্তিতে নদী-খাল-বিল খনন করে পানির প্রবাহ নিশ্চিত, হাওড়ের মাঝ দিয়ে অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করা, হাওড় সমস্যার স্থায়ী সমাধানে গবেষণা করে বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ, জলাবদ্ধতা নিরসনে কৌশলগত অবস্থান নির্ণয় করে স্লুইস গেট নির্মাণ এবং ফসল রক্ষা বাঁধের অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা।