নারী ও শিশু নির্যাতনের ৭০ শতাংশ মামলায়ই আসামিরা খালাস পাচ্ছে। এসব মামলায় সাজারও হার মাত্র ৩ শতাংশ। এমন তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায়। ৩২ জেলার ৪২টি ট্রাইব্যুনালে গত বছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক এ গবেষণা চালানো হয়েছে। গতকাল রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় এ গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। ৪ হাজার ৪০টি মামলার নথি ও রেজিস্টার বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পরিচালিত এই গবেষণায় মামলার সময়কাল, মুলতবির সংখ্যা, সময় প্রার্থনার পুনরাবৃত্তি, সাক্ষী-অভিযুক্তের তথ্য, ফরেনসিক ও ডাক্তারি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন। ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা (সেলপ) কর্মসূচির উদ্যোগে আয়োজিত এ সভা সঞ্চালনা করেন কর্মসূচিটির আইনি সহায়তা ও পলিসি অ্যাডভোকেসির প্রধান এ টি এম মোরশেদ আলম। গবেষণার পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুম।
গবেষণায় যা পাওয়া গেছে : গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে সময় লাগছে ১ হাজার ৩৭০ দিন, অর্থাৎ প্রায় ৩ বছর ৭ মাস। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার করে তারিখ পড়ছে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার চিত্র তুলে ধরে। এ ছাড়া ১৩ শতাংশ মামলায় আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। গবেষণায় বিচার বিলম্ব ও খালাসের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘনঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ সংগ্রহ এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব।
গবেষণায় বলা হয়, এসব কাঠামোগত সমস্যার কার্যকর সমাধান না করেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫-এ মামলার সময়সীমা কমিয়ে ৯০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি উন্নয়নে গবেষণায় একাধিক সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- আইনি সময়সীমা কঠোরভাবে তদারকি, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি কমানো ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, সময়মতো ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্ট প্রদান, তদন্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রসিকিউটরদের কার্যক্রম মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা। পাশাপাশি ভুক্তভোগী-সংবেদনশীল বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, গোপনীয়তা রক্ষা, আইনি সহায়তা ও কাউন্সেলিংসহ সহায়ক সেবা সম্প্রসারণ এবং অধিক চাপযুক্ত জেলাগুলোতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।