সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা এই দেশকে আবার স্বাধীন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বাংলাদেশ একসময় পরাধীন ছিল। আমাদের পূর্বপুরুষরা এই বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে। তারপরও বিভিন্ন সমস্যা হয়েছে দেশে। সমাবেশে অন্যদের মধ্যে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল আলম বক্তব্য দেন। খাল পুনঃখনন উদ্বোধন শেষে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে বন্ধ থাকা সব কারখানা চালু করা হবে। প্রয়োজনে প্রাইভেট খাতে ছেড়ে দিয়ে চালু করতে চাই। এতে বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হবে। যেসব দেশে শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে, সেগুলোও আমরা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি। অতিদ্রুত সেসব দেশে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টেরও চেষ্টা করছি।’ গতকাল দুপুরে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া নদীর খাল পুনঃখননকাজ উদ্বোধন শেষে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, হুইপ জি কে গউছ ও সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা, রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী, বিএনপি নেতা এম এ মালেকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
‘দুলাভাই’ ‘দুলাভাই’ স্লোগান ও প্রধানমন্ত্রীর রসিকতা : খাল উদ্বোধনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতাকালে উপস্থিত জনতা ‘দুলাভাই’ ‘দুলাভাই’ স্লোগানে মুখর করে তোলে সমাবেশস্থল। এতে সমাবেশস্থলে বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও পাল্টা রসিকতা করেন।
তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘কথা বলার সময় চুপ করতে হবে। আমি কথা বলি, শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে শুনতে হবে কথা। আর দুলাভাইকে কথা বলতে না দিলে, দুলাভাই যাবে গিয়া, যাই আমি। যাব?’ সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘সরকার গঠনের পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে আপনাদের সন্তান মুক্তাদিরকে (শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির) নিয়ে আমি বসেছিলাম। তাঁকে বলেছিলাম, কোথায় কোথায় বন্ধ কলকারখানা আছে, তা বের করেন। বন্ধের কারণ বের করেন। সবগুলো আমরা ধীরে ধীরে চালু করব। যাতে আমাদের দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হয়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের ভিতরে যাঁরা শিল্প উদ্যোক্তা আছেন, তাঁদের নিয়ে আমরা বসেছি। যাতে তাঁরা নতুন নতুন কারখানা তৈরি করতে পারেন। এতে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা চাকরি পাবে। শুধু তা-ই নয়, যেসব দেশের শ্রমবাজার বন্ধ আছে, সেগুলোও আমরা চালু করার ব্যবস্থা করছি। অতিদ্রুতই সেসব দেশে মানুষ যাওয়া আবার শুরু হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, সারা দেশে খাল খনন কার্যক্রম শুরু করব। আমরা শুরু করেছি। আজ এই বাসিয়া খাল পুনঃখননকাজের উদ্বোধন করলাম। এই খাল খনন শেষে দুই পাড়ে আমরা ৫০ হাজার গাছ লাগাব। সেখানে স্থানীয় লোকজন প্রকৃতির সান্নিধ্য পাবেন। বাসিয়া পুনঃখনন শেষ হলে সরাসরি ৮০ হাজার কৃষক উপকৃত হবেন। আর পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে আরও অন্তত দেড় লাখ মানুষ। এতে বছরে আরও ৭ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে। এর আগে সিলেট এসে নগরের বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি মেগা প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর নগর ভবনে সুধি সমাবেশে বক্তব্য দেন। সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করতে আমি যখন সিলেট এসেছিলাম তখন বলেছিলাম, সিলেট থেকে লন্ডন যেতে ৯ থেকে সাড়ে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ সিলেট থেকে বাই রোডে ঢাকা যেতে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই আমি সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের উন্নয়নের কথা বলেছিলাম। সরকার গঠনের পর আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক সম্প্রসারণকাজে জমি অধিগ্রহণে ১১টি জায়গায় সমস্যা ছিল। এজন্য কাজ আটকে ছিল। এই সমস্যাগুলো ইতোমধ্যে দূর করা হয়েছে।’ কেবল সড়কপথ নয়, সরকার রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগও নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ঢাকা-সিলেট রেলপথকে ডাবল লাইন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’ সিলেটে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ২০০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুত চালু করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ ছাড়া সিলেট হাসপাতালকে (ওসমানী হাসপাতাল) আমরা ১২০০ শয্যায় উন্নীত করব।’ তিনি বলেন, ‘কেবল চিকিৎসাব্যবস্থা নয়, আমাদের মতো দেশগুলোকে রোগ প্রতিরোধেও সচেতন হওয়া দরকার। এজন্য আমরা ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করব। যাদের ৮০ ভাগ হবেন নারী। এই স্বাস্থ্যকর্মীরা গ্রামে গ্রামে মানুষের বাড়িতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করবেন। কোন খাবার বেশি খেলে কোন রোগ হয় এসব ব্যাপারে অবগত করবেন।’ তিনি বলেন, ‘সিলেটে একটি আইটি পার্ক আছে। কিন্তু এটি সচল নেই। আমরা এটি দ্রুত সচল করার চেষ্টা করছি। যাতে তরুণরা এখানে কাজের সুযোগ পায়। ভকেশনাল সেন্টারগুলো আপডেট করারও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।’
নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এয়ারপোর্ট থেকে আসার সময় দেখছিলাম, বৃষ্টির কারণে পানি জমে গেছে। বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জের অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ ছাড়া সব নগরেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি ধীরে ধীরে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমরা খাল খনন কর্মসূচি নিয়েছি। তাতে বৃষ্টির পানি আমরা ব্যবহার করতে পারব। জলাবদ্ধতাও নিরসন হবে।’
ক্ষুদে শিক্ষার্থীরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ : বিকালে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে একেকজন বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর হবে। তোমরা স্পোর্টসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পৃথিবীর কাছে তুলে ধরবে। তোমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।’ তারেক রহমান বলেন, ক্ষুদে শিক্ষার্থীরাই ‘আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’। তাদের মধ্য থেকেই দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হবে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও খেলাধুলার মাধ্যমে নিজেদের গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি চাই, তোমরা যারা গ্যালারিতে বসে আছ তোমরা প্রত্যেকে একেকজন বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর হবে। বাংলাদেশের দায়িত্ব তোমাদেরকেই নিতে হবে। কারণ তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ।’ সিলেট স্টেডিয়ামে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। এরপর ‘আমরা নতুন, আমরা কুঁড়ি’ থিম সং প্রচার করা হয়।
কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে তা চলবে না : কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে এমন আচরণ আর চলবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মানুষ যদি কোনো সমস্যায় পড়ে তবে যেন নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারে। একটা কথা বলল, আর পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল। না, মানুষ এটা চায় না। কেউ যদি কোনো অপরাধ করে তবে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেটা অন্য ব্যাপার। গতকাল সন্ধ্যায় সিলেট শিল্পকলা একডেমিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আজকে এই রাস্তায় এত মানুষ ভিড় করল, তারা তো সবাই বিএনপি করে না, তবু কেন রাস্তায় নেমে এলো। কারণ মানুষ মনে করে, বিএনপি এখনো সঠিক পথে আছে। তাই মানুষ রাস্তায় নেমে তাদের সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু এই সমর্থন ধরে রাখতে পরিশ্রম করতে হবে, ছাড় দিতে হবে। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদের হুইপ জিকে গৌছ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন মিলন ও মিফতাহ সিদ্দিকীসহ সিলেটের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী।