উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক জেলের কাছে মে দিবস এখনও তেমন পরিচিত নয়। তারা এ বিষয়ে আগ্রহীও নন।
উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটার পশ্চিমে সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর নদী, পূর্বে বিষখালী নদী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মৎস্য পেশার ওপর নির্ভরশীল।
জীবন বাজি রেখে যারা প্রতিনিয়ত সমুদ্রে মাছ শিকার করেন, এমন কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা আক্ষেপ করে বলেন, মোগো মে দিবস নাই, মোগো কোনো দিবস নাই, মে দিবস আবার কী?
জেলে ফারুক হোসেন বলেন, সাগরে যাই দাদন নিয়ে মাছ ধরতে। মাছ পেলে ১৬ ভাগের ৮ ভাগ মালিকের, আর বাকি ৮ ভাগ ৮ থেকে ১৮ জন জেলের মধ্যে ভাগ হয়। বাজার-সদাইয়ের খরচ শেষে লাভ থাকলে টাকা পাই, না থাকলে কিছুই পাই না। এত কষ্ট করে মাছ ধরি, তবু আজ পর্যন্ত শ্রমিক হিসেবে আমাদের কেউ দেখে না।
অপর জেলে আবদুর জব্বার (৬৩) বলেন, ৪২ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরি। জীবন বাজি রেখে পরিবারের মায়া ছেড়ে সাগরে যাই। কতবার যে ঝড়ে-জলোচ্ছ্বাসে পড়েছি, তার হিসাব নেই। এখন বয়স হয়েছে, তবুও জীবিকার জন্য সমুদ্রে যেতে হয়।
তিনি মাছ ধরার পাশাপাশি জাল বুনার কাজও করেন।
আরেক জেলে ইসমাইল হোসেন বলেন, দিবস দিয়ে কী হবে? কাজই বড়। কাজ না করলে খাব কী? সাগরে ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরি, আবার কূলে এসে জাল বুনি। সারাদিন জাল বুনে ৪০০ থেকে ৪৩০ টাকা পাই, তাও নিয়মিত না।
পাথরঘাটার ছগির হোসেন, আলতাফ মিয়া, হায়দার আলী, এমাদুলসহ অধিকাংশ মানুষই মৎস্য পেশার ওপর নির্ভরশীল। পরিবার-পরিজন ছেড়ে অনিশ্চিত সাগরে জীবন বাজি রেখে তারা মাছ শিকার করেন। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি)মৎস্য খাতের অবদান প্রায় ৩.৫০ শতাংশ। এত অবদান থাকা সত্ত্বেও মৎস্য শ্রমিকরা এখনও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। এমনকি মে দিবসেও তাদের কোনো গুরুত্ব নেই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) গবেষক এস. এম. জাকির হোসেন বলেন, উপকূলের জেলেরা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। কখনো জলদস্যুদের কবলে পড়ে প্রাণ হারান, কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে। কিন্তু এখনও তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, জেলেদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, সাগরে থাকাকালীন তারা ২৪ ঘণ্টাই কাজ করেন, তবুও তারা শ্রমিক হিসেবে গণ্য হন না।
উপকূলের জেলেদের অধিকার নিয়ে কাজ করা অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, মৎস্য খাতে শুধু মাছ ধরাই নয়, জাল বোনা, ট্রলার মেরামত, বরফ উৎপাদনসহ নানা কাজে হাজারো শ্রমিক জড়িত। জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও এই শ্রমিকদের বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা বা নীতিগত উদ্যোগ নেই। অনেক সময় ট্রলার ডুবে বা জলদস্যুদের হামলায় জেলেদের প্রাণহানি ঘটে।
তিনি আরও বলেন, শহরের গার্মেন্টস বা শিল্পখাতের শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, উপকূলের জেলেদের ক্ষেত্রে তা হয় না। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জেলেদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত ৭ বছরে বৈরি আবহাওয়ায় বরিশাল বিভাগে সমুদ্রগামী ২৫৯ জন জেলের মৃত্যু হয়েছে। বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা আরও বেশি। এছাড়া একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ১৮৮ জন জেলে নিখোঁজ রয়েছেন।