সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে পাহাড় আর রাতারগুলের মায়াবী প্রকৃতির কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অত্যাধুনিক স্থাপত্যের বিশাল হাই-টেক পার্ক। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে এ যেন বিদেশি কোনো ডিজিটাল ইকোনমিক জোন। কিন্তু ঝকঝকে এই কাচঘেরা দালানগুলোর ভেতরে গেলেই দেখা যায় এক কঙ্কালসার বাস্তবতা। ৩৩৬ কোটি টাকার প্রকল্প থেকে যে আইটি বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, চার বছর পরও তা কেবল নির্জনতা আর বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। যারা প্লট ও স্পেস বরাদ্দ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ আর গ্যাসের অভাবে চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। অন্যরা এখনো অপেক্ষায়। ফলে ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের স্থানে এখন শুধুই নীরবতা।
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ৩৩৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে শুরু হয়েছিল এই মেগা প্রকল্প। ১৬২.৮৩ একর জমির ওপর নির্মিত এই পার্কের মূল লক্ষ্য ছিল সিলেটে জ্ঞানভিত্তিক আইটি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা এবং বিশ্বমানের বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে অন্তত ৫০ হাজার তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের নথিপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে এই পার্কের ভূমি উন্নয়ন, ড্রেনেজ সিস্টেম, সুয়ারেজ, সার্ভিস ডাক্ট এবং স্ট্রিট লাইটিংয়ের বাস্তব অগ্রগতি ১০০ শতাংশ। এমনকি বৃক্ষরোপণ ও লেক উন্নয়নের কাজও শতভাগ শেষ দেখানো হয়েছে। কিন্তু দৃশ্যত এই অবকাঠামো যেন এক ‘ঘোস্ট টাউন’ বা পরিত্যক্ত নগরী। প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বড় বড় বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও একমাত্র র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ৩২ একর জমিতে কার্যক্রম শুরু করতে পেরেছে। বাকিদের চিত্র ভয়াবহ। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, হেলথ ল্যান্ডমার্ক হোল্ডিং লিমিটেড ১.৫ একর জমি বরাদ্দ নিলেও দুই বছর ধরে কনস্ট্রাকশন কাজ বন্ধ। টুগেদার আইটি ইন্ডাস্ট্রিজ ১ একর প্লট বরাদ্দ নিলেও বর্তমানে কনস্ট্রাকশন কাজ বন্ধ। ইনোটেক হোল্ডিংস ৩.৪২ একর জমি বরাদ্দ নিলেও কোনো স্থাপনাই নির্মাণ করেনি। এডিএন টেলিকম ও বঙ্গ টেকনোলজি ২০২৪ সালে চুক্তি করলেও অবকাঠামো নির্মাণের কোনো চিহ্ন নেই। এমনকি রাহমানিয়া সুপার মার্কেট ও ইএলবি লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানও কাজ শুরু করার পর এখন বন্ধ রেখেছে।
অনেক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিনিয়োগকারীরা এখানে বড় অঙ্কের মূলধন খাটানোর সাহস পাচ্ছেন না মূলত তিনটি কারণে। বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ দেওয়ার সময় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে পল্লী বিদ্যুতের খামখেয়ালি সরবরাহ এবং গ্যাস সংযোগ দিতেই পারেনি হাইটেক কর্তৃপক্ষ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ না পেয়ে বর্তমানে সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবহার করে কাজ চালাচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান র্যাংগস ইলেকট্রনিক্স। যেখানে ১০০০ মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা, সেখানে কাজ করছেন মাত্র ৩০০ জন।
সম্প্রতি হাইটেক পার্কে দেখা যায়, নিরাপত্তার দায়িত্বে কয়েকজন আনসার রয়েছেন। চারদিকে সুনসান নীরবতা। কাচের ভবনগুলো ব্যবহার না হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ নেই। ভবনের দেওয়ালগুলোয় শ্যাওলা পড়ে গেছে।
একমাত্র উৎপাদনে থাকা র্যাংগস ইলেকট্রনিক্সের হাই-টেক শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোরশেদ আলম যুগান্তরকে জানান, অনেক প্রত্যাশা নিয়ে এখানে ফ্যাক্টরি স্থাপন করলেও প্রাপ্তির খাতা প্রায় শূন্য। উৎপাদনে যে পরিমাণ গ্যাস প্রয়োজন, এর ৩০ ভাগ বাজার থেকে সিলিন্ডার এলপিতি কিনে চালানো হচ্ছে। এতে খরচ বাড়ছে বলে তারা পুরোদমে উৎপাদন করছেন না। স্থানীয়রা বলছেন, র্যাংগসকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পূরণ না করায় বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো আসতে চাইছে না।
সম্প্রতি সিলেট-৪ আসনের (কোম্পানীগঞ্জ-গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর) সংসদ-সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী পরিদর্শন করেন হাইটেক পার্ক। নিজের নির্বাচনি এলাকায় মানুষ বেকার হয়ে আছে আর এখানে ৩৫০ কোটির এত বড় প্রকল্প করে ৪ বছর ফেলে রাখা হয়েছে! তিনি বলেন, খুব দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন। যে কোনোভাবে এ প্রকল্পকে কাজে লাগাতে হবে জানান। স্থানীয়দের মতে, নানা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের। তবে এবার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। সহকারী পরিচালক এসএম মামুন যুগান্তরকে জানান, নানা কারণে এতদিন বিনিয়োগকারীদের উৎপাদনে বাধ্য করা যায়নি। বর্তমান সরকার দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করবে হাই-টেক পার্ক। তিনি জানান, খুব দ্রুত বরাদ্দ নেওয়া প্রতিষ্ঠান মালিকদের চিঠি দেওয়া হবে। ২০ দিনের একটি সময়সীমা দেওয়া হবে। এর মধ্যে কাজ শুরু না করলে বরাদ্দ বাতিলের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার।