প্রায় এক দশক পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ স্থায়ী কমিটির সাতটি কার্যত শূন্য পদ পূরণকে সামনে রেখে নতুন নেতৃত্বে তরুণ ও প্রবীণের সমন্বয় ঘটানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দলীয় সূত্র ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে।
দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, চেয়ারম্যান, মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যসংখ্যা ১৯। এর মধ্যে বর্তমানে সক্রিয় সদস্য রয়েছেন ১২ জন।
স্থায়ী কমিটিতে দল পরিচালনা, রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়ে অবস্থান নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখানেই নেওয়া হয়। ফলে শূন্য পদগুলো পূরণকে দল পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের শূন্য পদে কাউকে আনা হবে কি না, সে বিষয়েও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বর্তমানে স্থায়ী কমিটিতে আছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (পদাধিকারবলে), আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ফাঁকা পদগুলোতে নিয়োগের জন্য এক ডজনের বেশি নেতা আলোচনায় রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন আবদুল আউয়াল মিন্টু, বরকতউল্লা বুলু, কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ, শামসুজ্জামান দুদু, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জহির উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, আমিনুর রশিদ ইয়াসিন, রুহুল কবীর রিজভী, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও হাবিব-উন-নবী খান সোহেল।
তবে শুধু পদ পূরণ নয়, এবারের কাউন্সিলকে ঘিরে আরো বড় পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। দলটির একাধিক নেতা জানান, প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে একটি আধুনিক, অংশগ্রহণমূলক ও নীতিনির্ভর কাউন্সিল আয়োজনের চিন্তা করা হচ্ছে। এতে দেশের সমসাময়িক নানা ইস্যু—অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা থাকবে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বড় রাজনৈতিক দলগুলোর আদলে কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
দলীয় নেতারা বলছেন, এবার নবীন ও প্রবীণ নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটানো হবে। তুলনামূলক কম বয়সী, সক্রিয় ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদের সামনে আনা হবে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ নেতাদেরও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং আমাদের নেত্রীকে কারাগারে নেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে এত বছর কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। এখন সময় এসেছে কাউন্সিল করার।’ তিনি বলেন, দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মধ্য থেকেই শূন্য পদ পূরণ করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘কাউন্সিল করা জরুরি। বর্তমান কমিটিগুলো পুনর্গঠন বা নতুন করে গঠন করতে হবে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব কাউন্সিল করার চেষ্টা করব। তবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অগ্রাধিকার থাকে।’
তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে দলের নেতারা ব্যস্ত থাকলেও সাংগঠনিক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
কাউন্সিলের সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের শূন্য পদে কাউকে আনা হবে কি না, সে বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে দলের জ্যেষ্ঠ এই নেতা বলেন, ‘এগুলো স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। চেয়ারম্যান চাইলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়োগ দিতে পারেন, তবে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করি।’
বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত ছয়টি কাউন্সিল হয়েছে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনা গ্রিনে জিয়াউর রহমান প্রথম কাউন্সিলের মাধ্যমে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯৮৪, ১৯৮৯, ১৯৯৩, ২০০৯ ও ২০১৬ সালে কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘সরকারের ভেতরে দল যেন বিলীন না হয়ে যায়, সেভাবেই কাজ করা হবে। এ জন্য কাউন্সিল খুবই প্রয়োজন।’
দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাউন্সিলের প্রস্তুতি এগোচ্ছে। তবে ঠিক কবে নাগাদ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে, নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেন, কোরবানি ঈদের আগে কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা কম; প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরো সময় লাগতে পারে।
বিএনপির কাউন্সিল বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে দলের সমর্থনভিত্তি বাড়ে এবং নেতৃত্বের বৈধতা শক্তিশালী হয়। তাঁর মতে, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন দলের সাংগঠনিক শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক।