Image description
টানা বৃষ্টির পর রোদের হাসিতে কিছুটা স্বস্তি

ষাট বছরের ছয়দুর রহমান বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটছিলেন। ছেলেকে নিয়ে ত্রিপলে করে টেনে আনছিলেন সেই ধান। যেখানে রাখছিলেন, সেটুকুও ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। এনজিও থেকে নেওয়া ঋণ কীভাবে শোধ হবে, সেই চিন্তায় দিশাহারা নেত্রকোনার মদন উপজেলার এই বৃদ্ধ। তার মতো হাজারো কৃষকের একই গল্প এবার বিভিন্ন হাওড়ে। এদিকে টানা চার দিনের বৃষ্টির পর বৃহস্পতিবার হাওড়ের আকাশে উঁকি দিয়েছে এক ফালি রোদ। এতে কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওড়গুলোয় যেন নতুন করে প্রাণ ফিরেছে। কাটা ধান শুকানোর ধুম পড়েছে। আশায় বুক বেঁধেছেন কৃষক। তারা বলছেন, এভাবে এক সপ্তাহ রোদ থাকলে পানি কমে যাবে। তবে বৃষ্টি হলে আগাম বন্যার আশঙ্কাও থাকবে। শ্রমিক সংকটেও বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও কোথাও কোথাও মিলছে না শ্রমিক।

সরকারি হিসাবে, চার জেলার হাওড়ে ৩১ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির আধা পাকা ধান তলিয়েছে পানিতে। এর মধ্যে ৫১ ভাগ ফসল কাটা হলেও শুকাতে বেগ পেতে হচ্ছে চাষিদের। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

হবিগঞ্জ : ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬শ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় ৩ হাজার ৩০০ হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে যায়। এদিন রোদের দেখা মেলায় ধান শুকানো নিয়ে কৃষকের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলও কমেছে। নামছে নদীগুলোর পানিও। তবুও আগাম বন্যার আশঙ্কা কাটেনি। বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের সুরুজ আলী যুগান্তরকে বলেন, রোদ ওঠায় ধান শুকাতে পারছি। এভাবে কয়েকদিন থাকলেই আর ধান তোলা নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকবে না। তিনি জানান, তিনি বেশ কয়েক কেদার জমি আবাদ করেছিলেন। চোখের সামনেই এসব জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক পাচ্ছেন না। কোনো উপায় না পেয়ে নিজেই ধান কাটছেন। একই উপজেলার সুজাতপুর শতমুখা গ্রামের বাসিন্দা শিবলী চৌধুরী বলেন, শুধু খাওয়ার উপযোগী ধান তুলতে পেরেছি। ২/৩ কেদার জমির ধান কাটতে পেরেছি। বাকি ধান এখনো পানিতে। অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ দ্বীপক কুমার পাল বলেন, আপাতত আগাম বন্যার তেমন আশঙ্কা নেই। তবে একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। যদি বৃষ্টি আবারও বাড়ে তবে বন্যা হতে পারে। জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ বলেন, আশার খবর হলো-উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল কমেছে। ফলে নদীগুলোয়ও পানি কমছে। নদীর পানি নিচে নেমে গেলে হাওড়ের পানিও কিছুটা কমবে।

সুনামগঞ্জ ও শাল্লা : বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বৃষ্টি হয়নি। দুপুরের পর থেকে সপ্তাহখানেক পর রোদের দেখা মিলেছে। কৃষক বলছেন, পানির নিচ থেকে ফসল ভেসে উঠতে আরও কমপক্ষে এক সপ্তাহ রোদ থাকা লাগবে। তারা জানান, হাওড়ে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় হারভেস্টার মেশিন কাজ করছে না। অপরদিকে পানিতে নেমে ধান কাটতে আগ্রহী নন শ্রমিকরা। যেসব শ্রমিক ধান কাটতে চান, তাদের মজুরি দিতে হচ্ছে দ্বিগুণ। এ নিয়ে কৃষক চরম বিপাকে পড়েছেন। যারা কিছুটা ধান কেটেছিলেন, শুকাতে না পারায় চারা গজিয়েছে।

দেখার হাওড়পারের কৃষক রবিউল বলেন, এবার ফসল নিয়ে আমরা রয়েছি মহাবিড়ম্বনায়। প্রথমদিকে বৃষ্টিতে কাঁচা-আধ পাকা ধান তলিয়ে যায়। এবার পাকা ধানও পানির নিচে। এ অবস্থায় কী করব, বুঝতে পারছি না। সামনে অন্ধকার দেখছি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, বাঁধ ভেঙেছে দুটি। এগুলো হলো-মধ্যনগরের এরন বিল এবং একই উপজেলার জিনারিয়া বাঁধ। এই বাঁধগুলো বড় হাওড়ের না হলেও এসব বাঁধ ভেঙে তিনটি ছোট হাওড়ে পানি ঢুকেছে। হাওড়ে পানিতে ১৩ হাজার ৭৯ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৭ হেক্টর। এখন পর্যন্ত হাওড়ে ৫১ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। তিনি জানান, আরও চার থেকে পাঁচ দিন পর পুরো ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাবে। সুনামগঞ্জ হাওড় ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, কৃষি অধিদপ্তর মনগড়া তথ্য দিচ্ছে। সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার মধ্যে দোয়ারাবাজার ছাড়া সবকটি উপজেলার ধান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, রোদ ওঠাটা স্বস্তির। কৃষক হাওড়ে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে সুবিধা পাবেন।

নেত্রকোনা ও কলমাকান্দা : হতদরিদ্র ৬২ বছরের ছয়দুর রহমান। বয়সের ভারে কাঁপছিলেন। ভাগ্য বদলাতে ঋণ করে মাত্র ১ একর জমিতে বোরোর আবাদ করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিই যেন তার সবকিছু এলোমেলো করে দিল। ধান কেটে ঘরে তোলার আগেই বৃষ্টিতে ডুবে গেছে ধানখেত। মদন উপজেলার উচিতপুর হাওড়ে ডুবে যাওয়া ধান বুকসমান পানি থেকে কেটে তুলছিলেন তিনি। এই ধান দূর হাওড়ের জমি থেকে ত্রিপলে করে টেনে আনছিলেন ছেলেকে নিয়ে। মদন-খালিয়াজুরী সড়কের যে স্থানে স্তূপ করে রাখছিলেন তিনি, সেটিও ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছিল। বুধবার সন্ধ্যার আগে কথা হয় যুগান্তরের প্রতিবেদকের সঙ্গে।

এনজিও থেকে নেওয়া ৬০ হাজার টাকা ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা এই হতদরিদ্র কৃষক। ছয়দুর রহমান নেত্রকোনার মদন উপজেলার গোবিন্দ্রশ্রী গ্রামের বাসিন্দা। বৃহস্পতিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, জমিতে প্রচুর খরচ হয়। এ খরচ মেটাতে একটা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলাম। এখন তো আমার সব শেষ হয়ে গেল। একই এলাকার কৃষক মুখলেছ মিয়া বলেন, বৃষ্টিতে ধান নষ্ট না হলে জমি থেকেই আমার পরিবারের ৬ মাসের চালের ব্যবস্থা হয়ে যেত। বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ হতো। এখন যে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটব, তারও কায়দা (উপায়) নেই। একজন শ্রমিক আনতে গেলে ১৫শ টাকা দিতে হয়। সঙ্গে তিন বেলা খেতে দিতে হয়, তাকে বিড়ি কিনে দিতে হয়। সব মিলিয়ে একজন শ্রমিকের পেছনে প্রতিদিন ১৮শ টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ তাকে ৩ মন ধানের টাকা দিতে হচ্ছে। এখন ঋণ কীভাবে শোধ করব, খাব কী, তাই ভাবছি।

বৃহস্পতিবার কলমাকান্দার নাগডড়া এলাকার ফুলবাইন বাঁধ ভেঙে হাওড়ে পানি প্রবেশ করে। জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, জেলার প্রায় ৯ হাজার ৩৫ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। আমরা বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলেছি।

কিশোরগঞ্জ : টানা চার দিনের বৃষ্টির পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কিশোরগঞ্জে রোদ উঠেছে। এতে বোরো ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা কৃষকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সকাল থেকেই কৃষক ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলার নিকলী, করিমগঞ্জ ও বাজিতপুরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় শ্রমিকরা জমিতে পাকা ধান কাটছেন। ট্রাকসহ ছোট-বড় যানবাহনে করে কাটা ধান খলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মাড়াইয়ের জন্য। খলায় স্তূপ করে রাখা ধানও কৃষক রোদে নাড়ছেন। অনেককে ভেজা খড় সড়ক ও খোলা মাঠে ছড়িয়ে শুকাতেও দেখা যায়।

আরও বিভিন্ন স্থানে ফসলের ক্ষতি: বৃহস্পতিবার নেত্রকোনার মদন উপজেলার তলার হাওড়ের কৃষক শিপন বলেন, আমি ৫ একর জমিতে বোরো চাষ করি। কিছু পাকা ও আধা পাকা ধান সংগ্রহ করেছি। গরুর খাদ্য খড় পানিতেই নষ্ট হচ্ছে। এ বছর গবাদি পশুর খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দেবে। একই জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায় ১ হাজার ৩৭৫ একর বোরো তলিয়ে গেছে। ময়মনসিংহের নান্দাইলে ৯০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুমিল্লার লাকসামে ১৪০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।