Image description

নব্বইয়ের দশকে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিল শীর্ষ সন্ত্রাসী হুমায়ুন কবীর ওরফে মুরগি মিলন। তাকে খুনের ঘটনা ঢাকাই অপরাধ জগতে বহুদিন ছিল আলোচিত। তখনকার শীর্ষ অপরাধীদের কুখ্যাত গ‍্যাং ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের অন‍্যতম সদস‍্য মুরগি মিলনকে টিটনের চেয়েও ফিল্মি কায়দায় করা হয়েছিল হত্যা।

দিনটি ছিল ২০০০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন পুরান ঢাকার আদালতে মামলার হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন মুরগি মিলন। প্রকাশ্যে ব‍্যস্ততম জজকোর্ট চত্বরে খুনিরা তাকে ঘিরে ধরে পাখির মতো গুলি করে। এর আগে পুলিশ ও জনতার দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ফেরাতে ঘটানো হয় একের পর এক ককটেলের বিস্ফোরণ। গা হিম করা ওই কিলিং মিশন চালিয়েছিল কুখ‍্যাত আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের অনুসারীরা। ওই হত্যাকাণ্ডের পর বেশ কিছুদিন খুন-পাল্টা খুনের এক অস্থির সময় পার করে রাজধানী ঢাকা। মুরগি মিলনের খুনের বদলা নিতে সেভেন স্টার গ্রুপও তাদের প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে কিলিং মিশন শুরু করলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকার অপরাধ জগৎ।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের খোঁজখবর রাখেন— এমন একজন জানান, ২৭ বছর পর শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদ যেমন তার ভাই হত‍্যার বদলা নিল, তেমনি টিটনের বোন জামাই হালের সবচেয়ে সক্রিয় ও ভয়ংকর সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনও নিশ্চয়ই হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না

মঙ্গলবার নিউ মার্কেট এলাকায় ফিল্মি কায়দায় খন্দকার নঈম আহমেদ টিটনকেও প্রায় একই কায়দায় ব‍্যস্ততম রাজপথে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত‍্যা করা হয়েছে। যিনি ছিলেন পুলিশের তালিকায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। এই খুনের পর যেসব তথ‍্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ফিরে আসছে মুরগি মিলনের স্মৃতি।

প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা আর আধিপত্য‍ বিস্তারের লড়াইয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধীদের সম্পর্কে হালনাগাদ তথ‍্য না থাকার সুযোগ নিচ্ছে তারা।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের খোঁজখবর রাখেন— এমন একজন জানান, ২৭ বছর পর শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ আহমেদ যেমন তার ভাই হত‍্যার বদলা নিল, তেমনি টিটনের বোন জামাই হালের সবচেয়ে সক্রিয় ও ভয়ংকর সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনও নিশ্চয়ই হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না। টিটনের অনুসারীরাও মরিয়া হয়ে উঠবে বদলা নিতে। মুরগি মিলন হত‍্যার বদলা নিতে যেমনটি করেছিল সেভেন স্টার গ‍্যাংয়ের সদস‍্যরা। এমন ফিল্মি কায়দায় ঘটতে পারে আরও অনেক খুনের ঘটনা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০১ সালে শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা ও ২০০৪ সালেই যাত্রা শুরু করা পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র‍্যাবের ধাওয়ায় দাগি অপরাধীদের অনেকেই পালিয়েছিল দেশ ছেড়ে। আবার কেউ কেউ গ্রেপ্তারও হয়েছিল। আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের শাসনকালে কখনো ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কখনো ‘ক্রসফায়ার’ নামের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড। বিদেশে কিংবা কারাগারে বসে নির্ধারিত কিছু ব‍্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছ থেকে চাঁদা তোলা ছাড়া বড় অপরাধ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রায় সবাই বিরত ছিল। সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অনেক আলোচিত সন্ত্রাসী তখন প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ ঠিকানা হিসেবে কারাগারকেই বেছে নিয়েছিল। তবে সময়ের ব‍্যবধানে বদলে গেছে অপরাধী ও অপরাধের ধরন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারামুক্ত হওয়া অনেকেই এখন অপরাধ জগতে পুরো মাত্রায় সক্রিয়। তাদের কেউ কেউ সন্দেহ আর অবিশ্বাসের জগতে পুরনো হিসাব মেলাতে খাটাচ্ছেন মাথা। এতেই অস্থির হয়ে উঠেছে অপরাধ জগৎ।

দীর্ঘ কারাবাসের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কারামুক্ত হয় ৯০ দশকে তেজগাঁও এলাকার ত্রাস সুইডেন আসলাম, মিরপুরের আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, মোহাম্মদপুরের ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, হাজারীবাগ এলাকার খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন ও খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু। এ ছাড়া কারামুক্ত হয়ে হাজারীবাগ ও ধানমন্ডি এলাকার আতঙ্ক সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন কারাগার থেকে বেরিয়ে পাড়ি জমান বিদেশে। তাদের মধ‍্যে সুইডেন আসলাম নিষ্ক্রিয় থাকলেও অন্য সবাই সক্রিয়। এমন তথ্যই জানা যাচ্ছে ঢাকার অপরাধ জগৎ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা কয়েকজনের সঙ্গে আলাপনে।

এর আগে শীর্ষ সন্ত্রাসীর তকমা মুছে কারামুক্ত হয় জোসেফ আহমেদ। দীর্ঘদিন তিনি ঢাকার অপরাধ জগতের একচ্ছত্র অধিপতি সেজে ছিলেন।

এসব সন্ত্রাসীর বেশিরভাগই এক থেকে দেড় যুগের বেশি সময় ধরে ছিল কারাগারে। এখনো কারাগারে আছে— এমন সন্ত্রাসীর কেউ কেউ মুক্তির জন্য জোর তদবির চালাচ্ছিল।

 

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরনো ও নতুন গজিয়ে ওঠা অপরাধীদের হালনাগাদ তথ‍্য নেই তাদের কাছে। কাজ চলছে নতুন তালিকা তৈরির।

তাদের দাবি, তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে বড় অংশই এখন দেশের বাইরে। মারা গেছে কেউ কেউ। তাদের বাইরে যারা কারাগারে রয়েছে, তাদের বেশিরভাগই দু-একটি মামলা ছাড়া অন্যগুলোয় খালাস পেয়ে কিংবা জামিন নিয়ে কারাগারে অবস্থান করছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এখন তারা জামিনে বের হয়ে আসছে।

২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম প্রকাশ করে। তাতে নাম ছিল আব্বাস, হেলাল, টিটন ও রাসুর। এই চারজনসহ জামিনে বের হওয়া প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই হত্যা, হত্যাচেষ্টাসহ আরও মামলা রয়েছে। কোনো কোনো মামলায় তাদের হয় সাজাও। আবার কোনো কোনো মামলায় উচ্চ আদালত থেকে অব্যাহতিও পায় কেউ কেউ।

সুইডেন আসলাম নিষ্ক্রিয় থাকলেও অন্য সবাই সক্রিয়। এমন তথ্যই জানা যাচ্ছে ঢাকার অপরাধ জগৎ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা কয়েকজনের সঙ্গে আলাপনে

ঢাকার অপরাধ জগৎ নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, বড় অপরাধীদের মামলা, জামিন, গ্রেপ্তার ও সামগ্রিক কার্যক্রমের ওপর পুলিশের বিশেষ শাখাসহ অন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সবসময় করত নজরদারি। সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাঠামোয় ভঙ্গুর অবস্থা তৈরি হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা খুব সহজেই বের হয়ে আসছে। তবে বের হওয়ার পর তাদের ওপর কোনো নেই নজরদারি।

যদিও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলামের দাবি, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কেউ যাতে নতুন করে অপরাধে জড়াতে না পারে, তা নিশ্চিতে সক্রিয় তারা। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘জামিনে বের হয়ে কেউ যেন নতুন করে অপরাধমূলক কাজে জড়াতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী, গডফাদার বা যেকোনো পরিচয়েই হোক, অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

কোনো অপরাধী কারামুক্ত হলে তাতে অপরাধের মাত্রা বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয় বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মত, ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগারে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করত বাইরের অপরাধ। তাই জামিনে মুক্ত হলে তাদের অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়।’

তিনি বলছিলেন, ‘জামিনে বের হওয়া সন্ত্রাসীরা আবার পুরনো অপরাধের নেটওয়ার্ক সচল করছে কি না, সে বিষয়ে কঠোর নজদারি থাকা প্রয়োজন। তা না হলে ছাত্র-জনতার নতুন বাংলাদেশের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটি নষ্ট হবে।’

ঢাকার অপরাধ জগৎ যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, প্রায় সবারই নব্বইয়ের দশকে উত্থান। যাদের বয়স ৬০ পেরিয়ে। স্বাভাবিক জীবনে থাকা তাদের বন্ধু-স্বজনরা যখন কাটাচ্ছে অবসর জীবন, তখন তারা নিরন্তর মাথা খাটিয়ে চলেছে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে। ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে হলে থামাতে হবে এসব বুড়ো মাথার ভেলকি।