দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হামলার হুমকি গোয়েন্দা নজরে আসার পর এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল ইউনিটের প্রধান থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে সতর্ক করা হয়েছে। পোশাকে ও সাদা পোশাকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন।
এ ছাড়া জঙ্গি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম মোকাবিলায় কাজ করা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি), অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) জঙ্গি কার্যক্রম সংশ্লিষ্টদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে। পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের সদস্যরাও এ নিয়ে কাজ করছেন। সরকারি সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে যারা আসা-যাওয়া করছেন তাদের তল্লাশি ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
দেশের ৮ বিমানবন্দরে হাই এলার্ট: জঙ্গি হামলার শঙ্কায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশাপাশি রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের ৮ বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে শাহজালাল বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ সকল স্থানে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সিভিল এভিয়েশন সূত্র জানায়, পুলিশ সদরদপ্তর থেকে সতর্কতার চিঠি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকেও দেয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার পরপরই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) উচ্চমাত্রার সতর্কতা জারি করে। বিমানবন্দরের কর্মরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সকল ইউনিটকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়।
বিমানবন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা। গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। পোশাকে ও সাদা পোশাকে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সবধরনের নিরাপত্তা হুমকি বিবেচনা করে পূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অ্যারাইভাল ও ডিপারচার সবক্ষেত্রে নিরাপত্তা তল্লাশিও জোরদার করা হয়েছে। কোনো কিছু অস্বাভাবিক দেখামাত্রই দ্রুত রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। বিমানবন্দরে যেসব যানবাহন প্রবেশ করছে সেগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা হুমকি আমরা পাইনি। তারপরও আগাম সতকর্তা নেয়া হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠির পর দেশের ৮টি বিমানবন্দরে নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিমানবন্দরগুলো সব সময়েই নিরাপত্তা বলয়ে থাকে এরপরও পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠি পাওয়ার পর তা আরও বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে হঠাৎ করে জঙ্গি হামলার হুমকির বিষয়টি সামনে আসায় জনমনে আতঙ্কের পাশাপাশি নানা প্রশ্নের দেখা দিয়েছে। যেখানে সাবেক ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, দেশে কোনো জঙ্গি নেই। আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারধর করেছে। যদিও তার পরেই বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে তখন জঙ্গিদের কোনো হামলার হুমকি ছিল না। তারা সংগঠিত হচ্ছে এমন খবরও দেয়নি পুলিশ। এ ছাড়া হামলার হুমকিতে সতর্কতা জারি করে চিঠি দেয়ার ঘটনা ঘটেনি। তাই এখন জঙ্গি হামলার শঙ্কা নিয়ে অনেক প্রশ্নের হিসাব মিলাতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। অনেকে মনে করছেন একটি গোষ্ঠী সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফে বলা হয়েছে, যেকোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অপতৎপরতা রুখে দেয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
উগ্রবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ নামে এক সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হামলার তথ্য পান গোয়েন্দারা। তার কাছ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। যার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক মিল পান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বিদেশে বসে থাকা মাস্টারমাইন্ড তুরস্কে অবস্থান করে হামলার কলকাঠি নাড়ছে। জঙ্গি-উগ্রবাদীদের তৎপরতা এবং হামলার শঙ্কা নিয়ে এর আগেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সর্বশেষ একটি বিশেষায়িত ইউনিটের প্রতিবেদনে শঙ্কার কথা জানানোর পর এটি আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
কিছুদিন আগে ওই ইউনিটের গোয়েন্দারাই খবর পেয়ে চট্টগ্রামে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সদস্যকে ধরার পর তাদের হামলার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, দুটি উগ্রবাদী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) ও তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এজেন্টরা বাংলাদেশে আসছে নানা অজুহাতে। লস্কর-ই-তৈয়বা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত একটি সালাফি জিহাদবাদী ইসলামি সশস্ত্র সংগঠন। ১৯৯০ সালে হাফেজ মোহাম্মদ সাঈদ, আবদুল্লাহ ইউসুফ আযযাম ও জাফর ইকবাল আফগানিস্তানে লস্কর-ই-তৈয়বা প্রতিষ্ঠা করেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের লাহোরের নিকটে মুরিদ নামক স্থানে সংগঠনটির অবস্থান। তাছাড়া তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) একটি দেওবন্দি জিহাদি উগ্রবাদী গোষ্ঠী। সংগঠনটি মূলত আফগান-পাকিস্তান সীমান্তের উভয় পাশ জুড়ে সক্রিয়।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে সেখানে ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের গ্রেপ্তারের তথ্য দেয়া হয়েছে। তবে তাকে কবে, কোন ইউনিটের গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেটি বলা হয়নি। চিঠিতে গ্রেপ্তার ইসতিয়াকের সঙ্গে চাকরিচ্যুত দুই সেনাসদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বোমা বিস্ফোরণ, দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে বলে জানতে পেরেছে পুলিশ সদর দপ্তর। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ বা সেনাবাহিনীর স্থাপনা ও তাদের সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র, শাহবাগ চত্বরের মতো জায়গা রয়েছে। সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনাও করে থাকতে পারে জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, এসব ব্যক্তি দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’।
এ পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নজরদারি বৃদ্ধি ও সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। চিঠিটি ২৩শে এপ্রিল হাইওয়ে, এপিবিএন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল, এটিইউ, পিবিআই, সিআইডিপ্রধান, র্যাব মহাপরিচালক, এসবিপ্রধান, পুলিশ স্টাফ কলেজের রেক্টর, নৌ-পুলিশের প্রধান, সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল, ডিএমপি কমিশনার, ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান, সিএমপি, কেএমপি, বিএমপি, এসএমপি, আরএমপি, জিএমপি, আরপিএমপি কমিশনার, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি, ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারসহ প্রতিটি ইউনিটিতে পাঠানো হয়।
লাপাত্তা কারাগার থেকে পালানো ৯ জঙ্গি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের কারাগার থেকে অন্যান্য দাগী সন্ত্রাসী, চরমপন্থির সঙ্গে ৯ জঙ্গিও পালিয়ে যায়। কিন্তু প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি সময়ের পরেও তাদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা কোথায় আছে কি করছে সে বিষয়ে খোঁজ পায়নি নিরাপত্তা বাহিনীগুলো। তবে জঙ্গি নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, জঙ্গিদের যেভাবে তৈরি করা হয় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা আর ওই পথ থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। তাই তারা আবার সংগঠিত হয়ে কাজ করছে। তবে পলাতক এই জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের সবক’টি ইউনিটকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
জঙ্গি হামলার শঙ্কা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্ক থাকার যে চিঠি দেয়া হয়েছে সেই চিঠি প্রাপ্তির কথা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা স্বীকার করলেও এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি কেউ। গোপনীয় থাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি। তবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেছেন, চিঠি পাওয়ার পর পরই নিজ নিজ এলাকার গুরুত্ব সরকারি স্থাপনা, বাসভবনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে জঙ্গি নিয়ে কাজ করা পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি। ইনশাআল্লাহ আমরা এটাকে মোকাবিলা করতে পারবো। এর পেছনে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত উল ফরহাদ মানবজমিনকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ৯ জঙ্গি কারাগার থেকে পালিয়েছে। তাদের কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, জঙ্গিরা যে ফর্মুলায় অর্গানাইজড হয়ে কাজ করে সেরকম কোনো সিচুয়েশন দেখছি না। তারা অনেক সময় সরকারের দুর্বলতা, ছন্নছাড়া অবস্থায় থাকলে কিছু করার সুযোগ নেয়। যখন মানুষের অসন্তুষ্টি চরম পর্যায়ে চলে যায় তখন তারা হামলা করে। আর কখনো তারা এমন হুমকি দিয়ে তাদের অস্তিত্ব জানান দেয়। অনেক সময় বাস্তবে কিছুই করে না।