দীর্ঘ এক যুগেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুন মামলার। ২০১৪ সালের এ দিনে (২৭ এপ্রিল) সাতজনকে অপহরণ করে খুন করা হয়। পরে একে একে তাদের লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে। এ ঘটনায় নিম্ন আদালতে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডসহ নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। পরে হাই কোর্টেও বহাল থাকে ১৫ আসামির ফাঁসির সাজা।
প্রায় সাত বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঝুলছে দণ্ডিত আসামিদের করা আপিল। ফলে কার্যকর করা যাচ্ছে না সাজা। ১২ বছরেও স্বজন হত্যার বিচার না পেয়ে হতাশায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির পর সাজা কার্যকরের দাবি তাদের। আসামিদের সাজা কার্যকর না হওয়ায় ভয় ও শঙ্কা নিয়ে দিন কাটছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, এ মামলায় আসামিপক্ষ আপিল করেছে। আদালতের নির্দেশের পরও তারা এখনো আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দেয়নি। সারসংক্ষেপ জমা হলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব। আর আসামিপক্ষের আইনজীবী জানিয়েছেন, সারসংক্ষেপ জমা দিতে তারা এখনো ক্লায়েন্টের নির্দেশনা পাননি। পেলে জমা দেবেন।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহরণ করা হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে। তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে ছয়টি লাশ, পরদিন মেলে আরেকটি। নিহত অন্যরা হলেন- নজরুলের সহযোগী তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন এবং গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও ইব্রাহিম। এ ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় আলাদা দুটি মামলা করেন। এ দুই মামলা একসঙ্গে হয় নারাণগঞ্জ আদালতে।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাব-১১-এর চাকরিচ্যুত সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম মাসুদ রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজার আদেশ দেন। বিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের জন্য রায়ের অনুলিপি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে যায় হাই কোর্টে।
একই সঙ্গে দণ্ডিত আসামিরাও আপিল করেন। পরে আপিল ও ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করে ২০১৮ সালে ২২ আগস্ট ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাই কোর্ট। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১১ আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন উচ্চ আদালত। ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর আলোচিত সাত খুন মামলায় ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাই কোর্টের ১ হাজার ৫৬৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। এরপর আসামিরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন। এ মামলার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যারা দণ্ডিত, ২০১৯ সালে তাদের পক্ষে একাধিক আপিল করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এ মামলায় আপিলকারী পক্ষকে সারসংক্ষেপ জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ১৯ নভেম্বর মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এ মামলায় আপিল করেছেন দণ্ডিত ব্যক্তিরা। যত দ্রুত সম্ভব রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে। আপিলকারী পক্ষ সার সংক্ষেপ জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ওপর দায়িত্ব আসবে। তখন আমরা দ্রুত সময়ে করতে পারব। আমরা যে কোনো মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চাই।
জানতে চাইলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মেজর (অব.) আরিফ হোসেনের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, সার সংক্ষেপ জমা দেওয়ার জন্য এখনো মক্কেলের ইনস্ট্রাকশন (নির্দেশনা) পাইনি। ইনস্ট্রাকশন পেলে আপিলের সার সংক্ষেপ জমা দেওয়া হবে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, তৎকালীন সরকার আসামিদের প্রচ্ছন্নভাবে সহযোগিতা করেছে। রায় কার্যকর হলে দেশে হত্যা ও গুমের যে সংস্কৃতি চালু হয়েছিল তা বন্ধ হয়ে যেত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকার মামলাটি অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেবে।
দ্রুত রায় কার্যকর চান নিহতদের স্বজনরা : দীর্ঘদিনেও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমরা ভেবেছিলাম, রায়টি দ্রুত কার্যকর হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তিই হলো না। আমরা চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমার স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। নিজের জীবন নিয়েও ঝুঁকির মধ্যে থেকে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছি। একসময় আমাদের ওপর হত্যার হুমকি ছিল, এমনকি আমাদের পাহারা দিয়েও রাখতে হয়েছে। এত প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ আমরা এ পর্যায়ে এসেছি শুধু ন্যায়বিচারের আশায়।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) আমাদের বাসায় এসে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাঁদের দল ক্ষমতায় এলে সর্বপ্রথম এই সাত খুনের বিচার নিশ্চিত করবেন। এখন তাঁর দল ক্ষমতায়। তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী। আমরা সেই আশ্বাস বাস্তবায়নের আশায় আছি। স্বজনহারাদের কষ্টের কথা তুলে ধরে নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সন্তান হারিয়েছেন এমন দুজন বাবা এরই মধ্যে মারা গেছেন। আমিও অনিশ্চয়তা নিয়ে বেঁচে আচি। মৃত্যুর আগে অন্তত সন্তানের হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই। সাতটি পরিবারই তাদের উপার্জনক্ষম সদস্য হারিয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো ধরনের সহায়তাও পায়নি।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিচার দ্রুত কার্যকর করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো সরকারের দায়িত্ব। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই। নিহত গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শামসুন্নাহার আক্তার নূপুর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, স্বামীকে হারানোর সেই মর্মান্তিক সময়ে আমি ছিলাম অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর নির্মম হত্যার মাত্র এক মাস পর জন্ম নেয় কন্যা রোজা আক্তার জান্নাত। আজ তার বয়স ১১ বছর, কিন্তু সে জীবনে বাবাকে দেখতে পায়নি। নূপুরের কণ্ঠে এখনো সেই বেদনার ভার, একদিকে স্বামী হারানোর অসহনীয় শোক, অন্যদিকে অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা।