‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে বর্তমান সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিতে রাষ্ট্রপতির কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। রোববার (২৬ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন রাষ্ট্রপতির কাছে এই আবেদন করেন।
রাষ্ট্রপতির কাছে লেখা আবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর তিনটি স্তম্ভ হলো আইন বিভাগ (জাতীয় সংসদ), শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। আইন বিভাগ বা জাতীয় সংসদ যেকোনো আইন প্রণয়ন বা বাতিল করতে পারে। এমনকি জাতীয় সংসদ চাইলে সংবিধানও সংশোধন করতে পারে। কিন্তু সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদ এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবে না, যা রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকে (Basic Structure) ভেঙে ফেলতে পারে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের জাতীয় সংসদ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ তথা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে ফেলেছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় হলো বিচার বিভাগের হৃৎপিণ্ড। যেমন হৃৎপিণ্ড ব্যতীত মানবদেহ অচল, তেমনি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ছাড়া বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না।
আবেদনে আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন বলেন, আমাদের বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাজের নিয়ন্ত্রণ যদি আইন, সংসদ ও বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে, তাহলে উক্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সারাদেশে বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ক্ষেত্রবিশেষে ব্ল্যাকমেইল করে তাদের পছন্দের ব্যক্তি বা আসামিদের পক্ষে জামিন, কোর্ট আদেশ ও মামলার রায়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করার সুযোগ পাবেন।
জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক কাঠামো তথা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ যদি আইনের মধ্যে এমন শর্ত রাখতো যে, পরবর্তীতে নতুনভাবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন হওয়া পর্যন্ত পূর্ববর্তী আইনসমূহের কার্যকারিতা বহাল থাকবে, তাহলেও সেটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া হতো। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, আইন প্রণয়ন করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে পুরোপুরি রহিত করে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম সরাসরি আইন, সংসদ ও বিচার মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ‘জঘন্য উদাহরণ’ পাওয়া দুষ্কর যে, জাতীয় সংসদ সরাসরি আইন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংস করেছে।
আইনজীবী মো. মাহমুদুল আবেদনে আরও উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের সংসদও তাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংস করেনি। ফলশ্রুতিতে ইসরায়েলের বিচার বিভাগ সক্রিয়ভাবে সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার করছে। অপরদিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংস করে পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যন্ত খারাপ ও জঘন্য নজির সৃষ্টি করেছে।
রাষ্ট্রপতির কাছে লেখা আবেদনে বলা হয়েছে, এমতাবস্থায় বর্তমান জাতীয় সংসদকে অযোগ্য (Unfit) ঘোষণা করে অবিলম্বে তা ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া একান্ত আবশ্যক। অতএব, মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে বিনীত প্রার্থনা এই যে, ক্ষমতাবহির্ভূতভাবে (Ultra vires) রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া এবং আইন প্রণয়ন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংস করার কারণে বর্তমান জাতীয় সংসদকে অযোগ্য (Unfit) ঘোষণা করে তা ভেঙে দেওয়ার (Dissolution) প্রক্রিয়া শুরু করে বাধিত করবেন।