Image description

পূর্ব লন্ডনের বহুজাতিক, বহু স্বরের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এবার এক ব্যতিক্রমী দৃশ্যপট সামনে এসেছে। একই পরিবারের দুই প্রজন্ম, দুই ভিন্ন ওয়ার্ডে, কিন্তু অভিন্ন লক্ষ্য ও রাজনৈতিক দর্শনকে সামনে রেখে নির্বাচনী অঙ্গনে অবতীর্ণ হয়েছে। টাওয়ার হ্যামলেটসের ব্রোমলি নর্থ ও বেথনাল গ্রিন ইস্ট এ দুই পৃথক ভূখণ্ডে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু মা রেবেকা সুলতানা এবং তার ছেলে হামিম চৌধুরী।

অভিজ্ঞতার ভারে সমৃদ্ধ রেবেকা সুলতানা নিজ ওয়ার্ড বেথনাল গ্রিন ইস্টে পুনরায় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।

স্থানীয় প্রশাসন, জনসম্পৃক্ততা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় তিনি টাওয়ার হ্যামলেটসের পরিচিত ও আস্থাভাজন মুখগুলোর অন্যতম। তার রাজনীতি মূলত তৃণমূল মানুষের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ, বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত এবং ধারাবাহিক জনসেবার প্রতিফলন। বেথনাল গ্রিন ইস্ট ওয়ার্ডের বর্তমান এ কাউন্সিলর ফের এই ওয়ার্ডেই নির্বাচন করছেন।

 

অন্যদিকে, ছেলে হামিম চৌধুরী নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির ব্যানারে প্রার্থী হয়েছেন ব্রোমলি নর্থ ওয়ার্ডে।

আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং প্রযুক্তি-সচেতন এই তরুণ প্রার্থীকে ঘিরে ইতিমধ্যেই পূর্ব লন্ডনের তরুণ সমাজে আলাদা একটি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড চৌকিদেখিতে পারিবারিক শিকড়। হামিমের পৈতৃক সূত্র বিয়ানীবাজারের দক্ষিণ দুবাগ এবং মাতৃকূল সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে। যেখানে তার নানা হাজী মোবারক মিয়া শিক্ষা বিস্তারে দানশীল ভূমিকার পাশাপাশি বিলেতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সংগঠকের ভূমিকায় পরিচিত ছিলেন।
 

হামিম চৌধুরীর দাদা মরহুম আলাউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন সিলেটের একজন সুপরিচিত রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী ও শিক্ষানুরাগী। পরিবারের রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারা আরো বিস্তৃত হয়েছে তার চাচাদের মাধ্যমে। যাদের মধ্যে রয়েছেন প্রয়াত শোয়েব চৌধুরী, ক্রীড়া সংগঠক ফেরদৌস চৌধুরী রুহেল, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক পাঁচবারের কাউন্সিলর ফরহাদ চৌধুরী শামীম, এবং ব্রিটিশ ব্যবসায়ী আশরাফ চৌধুরী হিরা, ফারুক ফুয়াদ চৌধুরী ও তোফায়েল চৌধুরী উজ্জল। ফুফু নাজনীন ইসলাম আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থায় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও রাজনীতিতেও সক্রিয়। পারিবারিক এই বিস্তৃত প্রভাবের বাইরে গিয়ে হামিম নিজস্ব পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন পূর্ব লন্ডনে।

ইংল্যান্ডে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই তরুণ পূর্ব লন্ডনের শিক্ষাঙ্গনেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে যুক্তরাজ্যের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ব্রিটেনের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

 

হামিমের পরিবারও পূর্ব লন্ডনের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে সুপরিচিত। তার বাবা আহাদ চৌধুরী বাবু লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিন ভাইয়ের মধ্যে হামিম দ্বিতীয়। বড় ভাই লাবিব চৌধুরী কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত, আর ছোট ভাই এখনো শিক্ষাজীবনে। রাজনৈতিক দর্শনের জায়গায় হামিম চৌধুরী স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করেন, ব্রিটিশ মূলধারার রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ এখন সময়ের দাবি। তাঁর ভাষায়, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণদের সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে এগিয়ে আসা অপরিহার্য। তিনি কেবল ভোটের রাজনীতি নয়, বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁর আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ, “আমি একদিন পরিবর্তন আনব।” এই নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে হামিম চৌধুরীর বিপরীতে রয়েছেন সাইদা রহমান। মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম। ব্রোমলি নর্থে দুজন কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন, যেখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে অ্যাসপায়ার পার্টিকে ঘিরে।

এ নির্বাচনে মা–ছেলের প্রার্থিতা শুধু একটি নির্বাচন নয়, এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নেতৃত্বের মসৃণ হস্তান্তরের প্রতিচ্ছবি। যেখানে অতীতের অভিজ্ঞতা মিলিত হচ্ছে বর্তমানের শক্তি ও ভবিষ্যতের স্বপ্নের সঙ্গে। নির্বাচনী লড়াই যতই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হোক না কেন, এই মা-ছেলের যুগল উপস্থিতি ইতিমধ্যেই ভোটারদের কৌতূহল, আগ্রহ এবং প্রত্যাশাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই, এই সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের শক্তি কি টাওয়ার হ্যামলেটসের রাজনীতিতে সত্যিই এক নতুন ইতিহাস রচনা করবে? সময়ের অপেক্ষা, সময়ই দেবে তার উত্তর।