Image description

ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের ফুটপাতের ব্যবসা এখন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনবহুল এলাকায় ফুটপাতজুড়ে বসে অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। পোশাক, ফলমূল, সবজি, জুতা, ইলেকট্রনিকস সামগ্রী থেকে শুরু করে খাবার সবকিছুই বিক্রি হয় এই বাজারে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান, পুলিশের অভিযান কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা কোনো কিছুই দীর্ঘমেয়াদে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা বন্ধ করতে পারছে না। প্রতিবার অভিযানের পর সামান্য কিছু সময়ের জন্য বিরতি দিয়ে আবারো আগের মতো জমজমাট হয়ে ওঠে ফুটপাত। পথচারীদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে হকার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও তা বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এই ফুটপাতের বড় অংশই দখল করে আছে হকাররা। কখনো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, কখনো পুলিশ, আবার কখনও যৌথ বাহিনী নামিয়ে হকার উচ্ছেদ করা হয়। এসব অভিযানে হকারদের দোকানপাট ভেঙে দেওয়া হয়, পণ্য জব্দ করা হয়। হকারদের পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এমন অভিযোগ বহুদিনের। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা ব্যবসা চালান। প্রতিদিন বা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে চাঁদা দিয়ে তারা নির্দিষ্ট জায়গায় বসার অনুমতি পান। ফলে প্রশাসনের অভিযান শেষ হওয়ার পর আবার তারা আগের জায়গায় ফিরে আসেন। এই চাঁদাবাজি বন্ধ না করলে হকার উচ্ছেদ কার্যত অসম্ভব। কিন্তু একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে এই উদ্যোগগুলো স্থায়ী ফল দিতে পারে না।

গবেষণা ও বুয়েটের তথ্যে জানা যায়, রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ ফুটপাতই দখল। এসব ফুটপাতের বেশিরভাগই ব্যবহার হচ্ছে ব্যবসার কাজে। এছাড়া নির্মাণসামগ্রী বা অবৈধ পার্কিংয়ের দখলেও আছে বেশ কিছু ফুটপাত ও সড়ক। এতে শহরের ৩৮ শতাংশ মানুষ বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে। আর সড়কের ২৬ শতাংশ দুর্ঘটনাই যার প্রধান উৎস।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সমন্বিত উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। টানা কয়েকদিনের অভিযানে অনেক জায়গায় ফুটপাতের জায়গা উদ্ধার করা হয়। আবার অনেক জায়গায় উচ্ছেদ করা জায়গাগুলো মুহূর্তেই দখলে নিয়েছেন হকাররা। নিউমার্কেট, মগবাজার, বাংলামটর, গুলিস্তান, বঙ্গবাজার, পান্থপথ, গ্রিন রোড, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, নাইটিঙ্গেল মোড়, খিলগাঁও ক্রসিং, মালিবাগ রেলগেট, ফার্মগেট, ইন্দিরা রোড ও কারওয়ান বাজার, মতিঝিল, গুলশান এলাকায়ও ফুটপাত ও রাস্তা থেকে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করা হয় সেসময়।

সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকার ফুটপাত মূলত পথচারীদের চলাচলের জন্য নির্মিত। কিন্তু বাস্তবে শহরের অধিকাংশ ফুটপাত দখল করে বসেছে দোকান। ফলে পথচারীদের চলতে হয় সড়কের ওপর দিয়ে যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে মতিঝিল, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, শাহবাগ, ফার্মগেট, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা এমন প্রায় সব এলাকাতেই একই চিত্র। সকাল থেকেই দোকান সাজাতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। বিকেল ও রাতে পরিণত হয় খোলা বাজারে। অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা নিয়মিত নয়। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। ফলে একদিন উচ্ছেদ হলেও পরদিন আবার বসে যায় দোকান। কিছু অসাধু ব্যক্তি বা চক্র ফুটপাত দখল করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ফুটপাত ফাঁকা থাকলে ভালো হতো। সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু এসব অভিযানে কোনো ফল হয়নি। ফুটপাত উচ্ছেদের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হচ্ছে না। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে নগরবাসীর জন্য হাঁটার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। ফুটপাতের দোকানপাট সব উঠিয়ে দিতে হবে। ফুটপাতের দোকানের জন্য নগরবাসীর ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ঢাকার সড়কে দুর্ঘটনায় নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি পথচারী। তাই পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার কাজ শুরু করা হয়েছে। সকলের সহযোগিতা পেলে দ্রুত সময়ে নগরবাসীর জন্য নিরাপদ চলাচলের পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেন, রাস্তায় যত্রতত্র ব্যবসা করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা যাবে না। তবে আমরা হকার ও রিকশাওয়ালাদের প্রতি অমানবিক হতে চাই না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা জনভোগান্তি দূর করার পাশাপাশি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে কাজ করছি।

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর ড. আদিল মুহাম্মদ খান ইনকিলাবকে বলেন, মেগাসিটি ঢাকায় কোনো কার্যকর হকার নীতিমালা নেই। ফলে উচ্ছেদ অভিযান হয়ে উঠছে সাময়িক ব্যবস্থা আর আড়ালেই থেকে যাচ্ছে হকার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট। উচ্ছেদের আগে যারা হকার বসায় লাইনম্যান, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী চাঁদার ভাগ পায় তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো সরকারই সিন্ডিকেট ভাঙতে তৎপর হয়নি। ঢাকার হকার উচ্ছেদ অভিযান প্রতিবারই ব্যর্থ হয়। হকাররা উচ্ছেদের পর আবার ফুটপাত দখল করে। উচ্ছেদ অভিযানের পর তারা আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে যায়।