Image description

রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে দালালচক্রের পাতা ফাঁদে পড়ে অবৈধভাবে ইউরোপ যেতে সব হারাচ্ছেন শত শত যুবক। অনিশ্চিত পথে পা বাড়ানো এ যাত্রায় খরচ হচ্ছে ১৫-২০ লাখ টাকা। তবে বিশাল অঙ্কের এ টাকা দিয়েও ভূমধ্যসাগরে সলিলসমাধি ঘটে অনেকের। এতে একদিকে পকেট ভারী হচ্ছে পাচারকারী চক্রের, বিপরীতে নিঃস্ব হচ্ছে অসংখ্য পরিবার। ঋণের বোঝা নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হয় তাদের।

নির্মম এ বাস্তবতায়ও থামছে না ‘ইউরোপ গেম’ নামের অবৈধ অভিবাসনের প্রবণতা। এর পেছনে সরকারের দায়সারা ভূমিকাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উচ্চাভিলাষী চিন্তা-ভাবনারও সমালোচনা করছেন তারা।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনইচসিআর) তথ্যানুযায়ী, যেসব যুবক সাগরপথে লিবিয়া থেকে ইতালি যান (ভূমধ্যসাগর), তার ৩৯ শতাংশই বাংলাদেশি। অর্থাৎ এ পথে ইতালি প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতি বছরই শীর্ষ অবস্থানে থাকে বাংলাদেশ। সংস্থাটির তথ্য বলছে, চলতি বছরের ২২ মার্চ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৯০১ জন সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে এক হাজার ৩৫৮ জন বাংলাদেশি।

এর পাশাপাশি অন্যান্য দেশের নাগরিকও আছেন। তাদের মধ্যে সোমালিয়া, পাকিস্তান, মিসর, সুদান, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, গিনি ও ইরানের নাগরিকরা শীর্ষ ১০-এ অবস্থান করছেন।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সি যুবকরা সবচেয়ে বেশি ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করেন, যার মধ্যে ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সিরাই বেশি। এদের বেশিরভাগের বাড়ি মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কুমিল্লা জেলায়।

লিবিয়া ফেরত ৫৫৭ বাংলাদেশির তথ্যানুযায়ী, তাদের ৬০ শতাংশের পরিবারকে স্থানীয় দালালরা ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়েছিল। কিন্তু ৮৯ শতাংশই চাকরি বা কোনো কাজ পাননি। উল্টো বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিতে পড়েন।

তবে এ দুর্জয়যাত্রায় সলিলসমাধি হয় অনেকের। সবশেষ সাগরপথে লিবিয়িা থেকে গ্রিসে যাওয়ার সময় গত ২৭ মার্চ প্রচণ্ড ঠান্ডা ও খাদ্যের অভাবে ১৩ যুবকের মৃত্যু হয়। তাদের সবার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। এ ঘটনায় ৩০ মার্চ জগন্নাথপুর থানায় দালালদের নামোল্লেখ করে মামলা করা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত মামলার কোনো অগ্রগতি নেই বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।

পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ হাজার ২৫৯ বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশ করেন। এ সময়ে কতজন মারা গেছেন বা নিখোঁজ রয়েছেন, তার কোনো হিসাব কারো কাছে নেই। তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম মনে করে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ১২ শতাংশ বাংলাদেশি।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, মানব পাচার রোধে আন্তর্জাতিক যে সংস্থাগুলো কাজ করে, তাদের সঙ্গে যৌথ প্রক্রিয়ায় যাওয়া যেতে পারে। সে প্রক্রিয়ায় কিন্তু অতীতে বাংলাদেশ গেছে এবং বেশকিছু দেশও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছিল। তাতে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়।

যদিও সরকার বলছে, পরিবার জেনেবুঝে তাদের সন্তানদের বিপদের দিকে ঠেলে দিলে সরকারের কিছু করার থাকে না। তবে অবৈধ পথে ইউরোপের উদ্দেশে পাড়ি দিয়ে যেন কেউ বিপদে না পড়ে, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে ইতালি বা গ্রিসে যাওয়ার জন্য কয়েকটি পন্থা ও রুট ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভ্রমণ ভিসায় আরব আমিরাত, মিসর, তুরস্ক, লিবিয়া এবং ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরবে গিয়ে সেখান থেকে লিবিয়া পৌঁছে ভূমধ্যসাগর দিয়ে ‘ইউরোপ গেম’ (সাগরপথে পাড়ি) দেওয়া হয়। এজন্য দালালদের দিতে হয় ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। কখনো কখনো এর বেশিও দিতে হয়। তবে এ গেমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাগরে ডুবে প্রাণ দিতে হয় যুবকদের। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া এবং বিচারকাজে ধীরগতির কারণে অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে চান না।

জানতে চাইলে সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ইজাজুল ইসলামের বোন জুলেফা বেগম বলেন, ‘আমার ভাইটা পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের ব্যবসা বিক্রি করে দালালের হাতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিল। কিন্তু সাগরে অনাহারে ও পিপাসায় তার মৃত্যু ঘটলে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। স্থানীয় দালাল তাকে লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রেখেছিল। সেখানে তাকে খেতে দেওয়া হতো না, দিনের পর দিন মারধর করা হতো। ফোনে সে আমাদের কাছে কান্নাকাটি করত। শেষবার বলেছিল, সে নৌকায় উঠছে। এটাই ছিল তার সঙ্গে আমাদের শেষ কথা।’

একই উপজেলার আমিনুর রহমানের ভাই মিজানুর আমার দেশকে বলেন, ‘ভূমধ্যসাগরে আমার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় মামলা করলেও এর কেনো অগ্রগতি নেই। আমরা আসামিদের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে মামলা দিয়েছি। তবু পুলিশ কোনো সহায়তা করছে না।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মানব পাচার মামলা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মানব পাচার আইনে ৮১০টি নতুন মামলা হয়েছে। পুরোনো মামলা ধরলে চার হাজার ৭৫৮টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে অন্তত তিন হাজার মামলা বিচারাধীন এবং এক হাজারেরও বেশি মামলার এখনো তদন্ত শেষ হয়নি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৪২ হাজার ৯৯২ জনকে।

অবৈধ অভিবাসন রোধের বিষয়ে জানতে চাইলে আসিফ মুনির আমার দেশকে বলেন, মানব পাচার রোধে প্রচার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। টেলিভিশন, পত্রিকা, ফেসবুকসহ বিভন্ন মাধ্যমে প্রচার চালালেও আমাদের দেশের গ্রামঞ্চলে এ প্রচার ওই ভাবে পৌঁছায় না। তাছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়মিত প্রচার চালানো হচ্ছে কি না, তারও তদারক করা প্রয়োজন। প্রচারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তি যেমন ইমাম, শিক্ষক, পুরোহিতদের কাজে লাগানো যেতে পারে। পাশপাশি তরুণদের আইডলদেরও কাজে লাগানো যেতে পারে।

অবৈধ অভিবাসন বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর আমার দেশকে বলেন, যারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ‘ইউরোপ গেম’ দিচ্ছে, তারা তো আইনগতভাবে যাচ্ছে না। অবৈধভাবে গিয়ে যদি কেউ বিপদে পড়ে, সেক্ষেত্রে তো আমরা চাইলেই পুরোপুরি আইনি সহায়তা দিতে পারি না। কারণ, সে আমাদের কাঠামো বা নিয়ম-কানুনের মধ্য দিয়ে যায়নি। বরং তাদের জন্য ইউরোপের দেশগুলোয় আমাদেরও ইমেজ ক্রাইসিসের মধ্যে পড়তে হয়। তাদের জন্য ওই সব দেশে বৈধ প্রবাসীরাও চাপে পড়েন। তবে আমরা যতটুকু ফ্রেন্ডলি আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনতে পারি, সেক্ষেত্রে তৎপরতা চালানো হয়।

নুরুল হক নুর আরো বলেন, হিউম্যান ট্রাফিকিংয়ের ক্ষেত্রে দুদেশেই হয়তো একটি চক্র আছে। বিশেষ করে তারা লিবিয়া কিংবা ইউরোপের অন্য কোনো দেশেও জড়িত থাকতে পারে। আর বাংলাদেশ থেকে কিছু আছে। আমাদের দেশ থেকে আমরা চেষ্টা করছি, এভাবে লোক গিয়ে যেন বিপদে না পড়েন।

পরিবারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রতিমন্ত্রী নুর। তিনি বলেন, প্রথমত পরিবারের দায়ভার রয়েছে। পরিবার যদি জেনেবুঝে বিপদের দিকে ঠেলে দেয় তার সদস্যদের, তাহলে সরকার কী করবে? ১৫, ২০, ৪০ লাখ টাকা খরচ করে অবৈধভাবে যেতে উৎসাহিত করার আগে বিপদ এবং ভবিষ্যতের কথা বুঝতে হবে। ঘরে ঘরে গিয়ে তো সরকারের পক্ষে সচেতন করা সম্ভব নয়।