ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ। অনেকাংশে আবেগও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটাই স্বপ্ন—বিশ্বমঞ্চে চোখ-ধাঁধানো পারফরম্যান্স। বিশেষ করে, যেসব দেশে ফুটবলই প্রধান খেলা, সেখানে ছোটবেলা থেকেই শয়নে-স্বপনে গ্যালারিভর্তি দর্শকের সামনে বিশ্বমঞ্চ মাতানোর স্বপ্ন বুনেন তারা।
এ ছাড়া বিশ্বমঞ্চে কেবলই একটি গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা সামান্য পারফরম্যান্সই একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দিতে পারে। অসাধারণ খেলায় রাতারাতি কেউ-বা হয়ে উঠেন বিশ্বতারকা, আবার ব্যর্থতার ছায়াও ভবিষ্যতের ওপর ফেলতে পারে। তবে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে’ নিজের পায়ের জাদু দেখানোর বহুল কাঙ্ক্ষিত সুযোগও সবার কপালে জুটে না।
বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ আর লড়াইয়ের পর যখন সেই মঞ্চে দাঁড়ানোর সুযোগ আসে, তখন সেটিই একজন ফুটবলারের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত। কিন্তু সব গল্পই সুখের হয় না। সুযোগ পেয়েও চোটের কারণে বিশ্বকাপ মিস করা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা। আর এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর হতে পারে না। যদিও চোট ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য এক বাস্তবতা। তবে, এমন নিয়তি সবাই এক পাল্লায় মাপতে পারেন না। অনেকের কাছে এটি কেবলই দুঃস্বপ্ন।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার যৌথ আয়োজনে বিশ্বকাপ ঘিরে এখন উত্তেজনা তুঙ্গে। নিজেদের সেরাটা নিগড়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সবাই। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই চোটের থাবা অনেক দলের পরিকল্পনাকেই পুরোপুরি ওলটপালট করে দিচ্ছে। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকার মাঝেই ইনজুরির কারণে ছিটকে গেছেন বেশ কয়েকজন বড় তারকা। অনেক খেলোয়াড়, যারা কিনা বাছাইপর্বে অসাধারণ পারফরম্যান্সে ফুটবলপ্রেমীদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছিলেন; দলকে মূলপর্বে তুলেছিলেন, তারাই এখন দর্শক হয়ে সেই স্বপ্নের আসর দেখবেন। চোটে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে তাদের বিশ্বমঞ্চে আলোর দ্যুতি ছড়ানোর স্বপ্ন।
জ্যাক গ্রিলিশ
ইনজুরির তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছেন জ্যাক গ্রিলিশ। সাম্প্রতিক সময়ে এভারটন ও ইংল্যান্ডের হয়ে দারুণ ছন্দে ছিলেন তিনি। বল পায়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া, ডিফেন্স ভাঙা আর সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি—এই গুণগুলোর জন্যই আলাদাভাবে পরিচিত তিনি। তার অনুপস্থিতি ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগে স্পষ্ট প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে উইংয়ে আক্রমণের ধার কমবে, পাশাপাশি আক্রমণে যে বৈচিত্র্য ও সৃজনশীলতা তিনি এনে দিতেন, সেটির অভাবও বেশ অনুভূত হবে।
রদ্রিগো
চোটে পড়েছেন রদ্রিগো। ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় দুঃসংবাদ এটি। ক্যারিয়ারের সেরা ছন্দে থাকাকালীন সময়েই চোটের কবলে পড়েছেন রিয়াল মাদ্রিদ ও সেলেসাওদের এই নির্ভরযোগ্য আক্রমণভাগের অস্ত্র। তার এই অনুপস্থিতি সেলেসাওদের আক্রমণভাগে বড় শূন্যতা তৈরি করবে। বিশেষ করে তাকে ছাড়াই পরিকল্পনা সাজানো কোচ কার্লো আনচেলত্তির জন্য নিঃসন্দেহে কঠিন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
হুগো একিটিকে
ইনজুরির নির্মম শিকার হুগো একিটিকে। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সাবেক ক্লাব প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের (পিএসজি) বিপক্ষে খেলতে গিয়ে লিভারপুলের বিদায়ের ম্যাচে চোটে পড়েন ফ্রান্স জাতীয় দলের এই তরুণ ফরোয়ার্ড। ম্যাচ চলাকালীন তার অ্যাকিলিস টেন্ডন ছিঁড়ে যায়। ফুটবলে সবচেয়ে গুরুতর ইনজুরিগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয় এটিকে। ২৩ বছর বয়সী এই ফরাসি ফরোয়ার্ডের জন্য এটি শুধু চলতি মৌসুমের ইতি নয়, বরং প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নেও বড় ধাক্কা। অন্তত ৯ মাস মাঠের বাইরে থাকতে হবে তাকে।
লুইস মালাগন
আয়োজক মেক্সিকোর প্রস্তুতিতেও ইনজুরির কালো ছায়া নেমেছে। জাতীয় দলে নিজের জায়গা প্রায় পাকা করে ফেলেছিলেন ক্লাব আমেরিকার গোলরক্ষক লুইস মালাগন। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে আস্থার কেন্দ্রেও পরিণত হচ্ছিলেন। তবে, চোটের কারণে হঠাৎ করেই ছিটকে যাওয়ায় গোলরক্ষক পজিশন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
হুয়ান ফয়েথ, ভ্যালেন্তিন কার্বোনি ও জোয়াকিন পানিচেল্লি
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা শিবিরে একের পর এক ইনজুরির ধাক্কা সব পরিকল্পনাকে একেবারে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। ভিয়ারিয়ালের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার হুয়ান ফয়েথ এবং উদীয়মান প্রতিভা ভ্যালেন্তিন কার্বনি দুজনেই চোটের কারণে ছিটকে গেছেন।
ফয়েথ রক্ষণভাগে অভিজ্ঞতা, শারীরিক দৃঢ়তা এবং বহুমুখিতা এনে দিতে পারতেন, বড় টুর্নামেন্টে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এটি। অন্যদিকে কার্বনির মতো তরুণ ও সৃজনশীল মিডফিল্ডার মাঝমাঠে গতি ও ভিন্নতা যোগ করার সক্ষমতা রাখতেন। অন্যদিকে চোট সমস্যায় আর্জেন্টাইন আরেক ফরোয়ার্ড পানিচেল্লিও চোটের কারণে বিশ্বমঞ্চ মাতানোর সুযোগ বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের অনুপস্থিতি আর্জেন্টিনার জন্য স্পষ্ট ক্ষতি, যা কি না দলটির ভারসাম্য ও বিকল্প পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
মোহাম্মদ সালিসু
এএস মোনাকোর এই ডিফেন্ডার দীর্ঘদিন ধরে ঘানার রক্ষণভাগে আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিলেন। তার শক্তিশালী ডিফেন্ডিং, শারীরিক উপস্থিতি এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দলকে অনেক ম্যাচে স্থিতিশীলতা এনে দিয়েছে। কিন্তু তার অনুপস্থিতি দলটির রক্ষণভাগে স্পষ্ট শূন্যতা তৈরি করবে।
হেসুস ওরোজকো
নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাময় প্রতিনিধি হিসেবে ধীরে ধীরে উঠে আসছিলেন ক্রুজ আজুলের এই তরুণ মেক্সিকান ফুটবলার। কিন্তু ইনজুরিতে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়া তার ক্যারিয়ারের অগ্রগতিতে বড় এক ধাক্কা। বিশ্বকাপের ঠিক আগে এমন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে হারানো মেক্সিকোর জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। এই পরিস্থিতি কোচিং স্টাফকে পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে এবং বিকল্প কৌশল নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে।
তাকুমি মিনামিনো
অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মিনামিনোর আক্রমণাত্মক মুভমেন্ট এবং বড় ম্যাচে খেলার অভিজ্ঞতা ছাড়াই জাপান দলকে মাঠে নামতে হতে পারে। এএস মোনাকোর এই মিডফিল্ডার দীর্ঘদিন ধরে ব্লু সামুরাইদের জন্য একজন নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর খেলোয়াড় হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। তাই তার অনুপস্থিতি জাপানের পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
স্যামু আঘেহাওয়া
এফসি পোর্তোর এই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ইনজুরির কারণে স্পেনের আক্রমণভাগে একটি ভিন্নধর্মী বিকল্প হয়ে ওঠার সুযোগ হারিয়েছেন। তার গতি, শারীরিক শক্তি এবং সরাসরি আক্রমণের ক্ষমতা দলকে বাড়তি মাত্রা দিতে পারত। এখন তার অনুপস্থিতি স্পেনের আক্রমণাত্মক পরিকল্পনায় একটি স্পষ্ট শূন্যতা তৈরি করেছে।
মার্সেল রুইজ
খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন মার্সেল রুইজ। মাঝমাঠে তার উপস্থিতি দলকে যেমন ভারসাম্য দিত, তেমনি আক্রমণে ধারাবাহিকতা বজায় রাখত। কিন্তু তার না থাকা দলটির জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ক্যামেরন কার্টার-ভিকার্স
ঘরের মাঠে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে লড়াইয়ের সুযোগ হারিয়েছেন ক্যামেরন কার্টার-ভিকার্স। তার অনুপস্থিতি স্বাগতিকদের রক্ষণভাগের গভীরতা ও স্থিতিশীলতায় স্পষ্ট প্রভাব ফেলবে।