দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে চলছে একরকম স্থবিরতা। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের বড় ধাক্কা লেগেছে তৈরি পোশাক খাতে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন কমে গেছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। গাজীপুর-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি জেনারেটর চালানোর জন্য চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ডিজেলও মিলছে না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং ব্যাহত হচ্ছে রপ্তানি কার্যক্রম। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো কম দামে ও দ্রুত সরবরাহ পাওয়া যায়- এমন উৎস থেকে পণ্য নেয়ার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের রপ্তানি খাত নিয়ে নানাবিধ সংকট দেখছেন উদ্যোক্তারা।
কারখানা মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে লোডশেডিং এতটাই বেড়েছে, পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে একদিকে সাধারণ জেনারেটর চালাতে হচ্ছে, অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিকল্প হিসেবে ক্যাপটিভ পাওয়ারের জেনারেটরও চালু রাখতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা খুব জরুরি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার রাজধানীর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে ভারত সহ অন্যান্য দেশে চলে যাচ্ছে। এক ক্রেতার সঙ্গে আলাপের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সে বলছে, ‘শুনলাম যে তোমার দেশে তো আর দুই তিন মাস পরে ইলেকট্রিসিটি থাকবে না। তোমাদের এত অর্ডার দিতে এখন আমাদের টপ ম্যানেজমেন্ট থেকে না করা হচ্ছে, এটা কিন্তু এখন ইন্ডিয়াতে যাওয়া শুরু করেছে’। আগামী জুলাই-আগস্টের কার্যাদেশ এখনই হারানোর তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু বড় বড় বায়িং হাউস, ওরা এই মেসেজগুলো (কার্যাদেশ অন্যত্র চলে যাওয়ার) কিন্তু আমাদের দেয়া শুরু করছে। আমরা কিন্তু এখন দেখছি যে, জুলাই আগস্টের অর্ডারগুলো থেমে গেছে। যেগুলো আসার কথা ছিল খুব স্লো হয়ে গেছে। খুব কষ্ট করে ডিসকাসন করা হচ্ছে (কার্যাদেশ পাওয়ার)।’
সাভারের আশুলিয়া এলাকার গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সাঈদ হাসান বলেন, পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্যগুলো ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য বিদ্যুৎ না থাকলেও কাজ বন্ধ রাখা যায় না। জেনারেটর দিয়ে হলেও কাজ চালিয়ে যেতে হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে জেনারেটর চালানোর জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের প্রয়োজন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেটি জোগাড় করা অনেক কঠিন। ডিজেলের জন্য ছুটতে হচ্ছে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে, লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারপরও জেনারেটর চালানোর জন্য অনেক সময় যথেষ্ট পরিমাণ ডিজেলও পাওয়া যায় না। ফলে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এনার্জি ক্রাইসিসের কারণ সার্বিকভাবে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে বলে আমরা ধারণা করছি। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন বাড়তি শুল্ক ঘোষণার পর গত টানা আট মাস ধরে পোশাক খাতে রপ্তানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি সংকটে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় সামনের মাসগুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানির হার আরও কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিজিএমইএ। ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রপ্তানি সংকুচিত হয়েছে ৭ শতাংশ। আগের মাস ফেব্রুয়ারি শেষে এই সংকোচনের হার ছিল ৫.৪৯ শতাংশ। যুক্তরাজ্যের একক বাজারে মার্চ শেষে তৈরি পোশাক রপ্তানির সংকুচিত হয়েছে ১.৬১ শতাংশ; আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে এই সংকোচনের হার ছিল ১.২২ প্রবৃদ্ধি শতাংশ।
রপ্তানিকারকরা বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির যে সংকট দেখা যাচ্ছে, সেটি যদি সহসাই সমাধান করা না যায়, তেলের সরবরাহ যদি স্বাভাবিক না থাকে, তাহলে টাইমলি মাল শিপমেন্ট করা কঠিন হয়ে পড়বে, আবারো খরচও বেড়ে যাবে। তখন বায়াররা নিজেদের স্বার্থেই বিকল্প মার্কেটের সন্ধান শুরু করবে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে অন্যান্য খাতের মতো শিল্প খাতেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সবার আগে আমাদের পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে। অথচ ক্রেতার সঙ্গে ইতিমধ্যেই আমাদের পণ্যের রপ্তানি মূল্য চূড়ান্ত করা হয়ে গেছে। এখন আমরা তাদের বলতে পারবো না যে, দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে- তোমরা মূল্য বাড়াও।
ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকটে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় অনেক সময় শিপমেন্ট ডিলে করতে হচ্ছে। এতে বায়াররা অসন্তুষ্ট হচ্ছে।
সরকারের আশ্বাস: বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে তৈরি পোশাক খাতে সংকট চলছে, সেটি সমাধানের জন্য সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। সরকার বলছে, সংকট সমাধানে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, তারা যে প্রধান সমস্যা নিয়ে আসছিল- ফুয়েল ক্রাইসিস, সেটা আমরা তাৎক্ষণিকভাবেই সমাধান করে দিয়েছি। সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে পোশাক ব্যবসায়ীরা আলাদা জ্বালানি কার্ড চেয়েছেন। আমরা সেটা করার বিষয়ে সম্মতি দিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গে তাদের ট্যাগ করে দিয়েছি।