Image description

শেখ হাসিনার দেহ ও মুখায়বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, নারীর সঙ্গে জামায়াত আমিরের আপত্তিকর ছবি, সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর দেহের সঙ্গে বিকৃত মুখায়বের ছবি কিংবা বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ‘বডি শেমিং’; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরহামেশাই চোখে পড়ছে। একই সঙ্গে বিকৃত ভাষা আর চরিত্র হননমূলক লেখালেখিও চলছে সর্বত্র। আলোচিত রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে নিয়ে এমন ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে এমন ছবি ও ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে। আর ছড়ানো হচ্ছে ফেসবুকে ভুয়া আইডি ও পেজ থেকে। তবে এই ঘৃণা প্রচারে অনেক পরিচিত মুখও দেখা যাচ্ছে। ফলে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে। এ জন্য সামাজিকমাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

বিদ্বেষের শিকার রাজনীতিকরা
ফেসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট করার অভিযোগে সম্প্রতি ভোলায় জামায়াতের নারী কর্মী বিবি সওদা সুমিকে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও পরে জামিনে মুক্তি পান তিনি। তার ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি বিএনপি সরকারের সমালোচনা করেছেন। কখনও সরকারি নীতির প্রশংসাও করেছেন। তবে বিএনপি এবং সরকারের শীর্ষপর্যায়ের ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের নিয়ে আপত্তিকর পোস্টও করেছেন।

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘এদিকে আমি প্রথমে পড়েছি, মেয়ের জামাইকে নিয়ে মুভি দেখতে সিনেমা হলে প্রধানমন্ত্রী।’ একই দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে ‘মার্কিন দালাল’ বলে পোস্ট করেন।

 

শেখ হাসিনার দেহ ও মুখায়বের সঙ্গে তারেক রহমানকে মিলিয়ে একটি ছবি সম্প্রতি সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নানা বেনামি আইডি ও গ্রুপের পাশাপাশি ছবি পোস্ট ও শেয়ার করেছেন অনেক পরিচিত মুখ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাউদ্দিন আম্মারও ছবিটি পোস্ট করেন।

 

আম্মার নিজেও বিদ্বেষমূলক প্রচারণার শিকার হয়েছেন। ‘ট্রল আরইউ’ নামের একটি পেজ থেকে তাকে ‘সমকামী’ দেখিয়ে একাধিক আপত্তিকর পোস্ট করা হয়। সেসব পোস্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি তার ভুয়া ও বিকৃত ছবি ব্যবহার করা হয়। একই পেজে ৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিন বিশ্বাসকে নিয়েও কুরুচিপূর্ণ পোস্ট করা হয়।

 

‘সাকিব ভাই ০২’ নামের একটি পেজ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাকে নিয়ে মিথ্যা তথ্যসংবলিত পোস্ট করা হয়। গত শুক্রবারের ওই পোস্টে তাদের ‘বিয়ে সম্পন্ন’ বলে দাবি করা হয়।

 

অন্যদিকে জামায়াত আমির ড. শফিকুর রহমানের সঙ্গে (নারীর) আপত্তিকর ছবি ছড়ানো হচ্ছে বিএনপি সমর্থক বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ ও আইডি থেকে। ‘কার্টুন আস ডেইলি’ শীর্ষক ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজে ড. শফিকুর রহমানের সঙ্গে এক নারীর আপত্তিকর কার্টুন প্রকাশ হয়। সেখানে দেখানো হয়েছে যে তারা জড়াজড়ি করে আছেন।

 

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে শারীরিকভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন ‘সাপোর্টার অব বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে। এই পোস্টে দেখানো হয়েছে, জুলাই থেকে উপদেষ্টা এবং এমপি হতে হতে শারীরিকভাবে স্থূল হয়েছেন নাহিদ।

 

ভুয়া পেজ ও গ্রুপের রমরমা

 

সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকৃত সব পোস্টকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নামে পেজ খোলা হয়। তারপর দলগুলোর লোগো ও পরিচিত নেতাদের ছবি ব্যবহার করা হয়। ফলে অনেকেই এগুলোকে বিশ্বাস করে বিভ্রান্ত হন।

 

চার লক্ষাধিক ফলোয়ার থাকা ‘জামায়াত শিবির অনলাইন’ নামের একটি পেজ থেকে তারেক রহমানকে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিম জং উন একনায়ক ও স্বৈরশাসক হিসেবে পরিচিত। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার মেয়েকে সঙ্গে রাখেন। পোস্টে বলা হয়, তারেক রহমানের সঙ্গেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার মেয়ে জাইমা রহমানকে দেখা যায়। এভাবে তুলনার মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তারেক রহমানসহ বিএনপির অন্যান্য নেতা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবির উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।

 

‘bnp news বিএনপি সংবাদ’ নামের ফেসবুক গ্রুপ থেকে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং ঢাবি শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামির ছবি সম্পাদনা করে আপত্তিকরভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রায় দুই লাখ সদস্য থাকা এই পাবলিক গ্রুপটিকে প্রথম দেখায় বিএনপির কোনো কমিউনিটি গ্রুপ মনে হবে। তবে বাস্তবে এটির সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলেনি।

 

বিএনপির পক্ষ নিয়ে এমন বিদ্বেষ ছড়ানো পেজ ও গ্রুপের মধ্যে রয়েছে, “bnp news বিএনপি সংবাদ” গ্রুপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/1312580836339764/
‘‘The public lens’’ পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/profile.php?id=61577297742442
‘‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী টেম্পুস্ট্যান্ড দল” পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/profile.php?id=100084033087165
‘‘বিএনপি নিউজ - BNP News’’ পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/Bd24BreakingNews
“মগবাজার – Mogbazar 2.0” পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/profile.php?id=61580446705936
Dr. Zubaida Rahman পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/abdulmoyeenkhan111/?locale=bn_IN
“নিউজ আপডেট” পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/profile.php?id=61582425992548
জামায়াতের পক্ষ নিয়ে এমন বিদ্বেষ ছড়ানো পেজ ও গ্রুপের মধ্যে রয়েছে “jamaat Shibir Onlinel – জামায়াত শিবির অনলাইন” পেইজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/jamaatshibironline
“কাঁঠেরকেল্লা – KatherKella” গ্রুপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/550444654064636
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গ্রুপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/783115342130768/
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আরেকটি গ্রুপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/1550880982067622/
Jamaat-e-Islami (Official BD) পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/JamaatBDOfficial

 

আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে এমন বিদ্বেষ ছড়ানো পেজ ও গ্রুপের মধ্যে রয়েছে “Supporter ofr Bangladesh Awami League”গ্রুপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/awamileague.1949group/about
Supporters of Bangladesh Awami League পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/profile.php?id=61570036836759
Awami League News গ্রুপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/awamileaguenews.1949/
Bangladesh Awami league - বাংলাদেশ আওয়ামী-লীগ গ্রুপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/bangladeshawamileaguenews/
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ || BANGLADESH AWAMI LEAGUE গ্রুপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/1011610423598504/
বাংলাদেশ আওয়ামী প্রজন্ম লীগ গ্রুপের লিঙ্ক https://www.facebook.com/groups/bdapl/
Bangladesh Awami League Mathbaria Upazila পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/profile.php?id=100072417011285
Cartunus Daily 2.0 পেজের লিঙ্ক https://www.facebook.com/SimpsonSagaBD

 

অধিকারেরও সীমাবদ্ধতা আছে

 

সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশের অনুচ্ছেদ ৩৯(২)(ক) তে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে একই অনুচ্ছেদে এটি সীমাবদ্ধও করা হয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা দেয়; এমন ক্ষেত্রে বাক স্বাধীনতার নীতি কার্যকর নয়।

 

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ক্রমাগতভাবে এই সীমাবদ্ধতা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এই অপরাধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী রাজনীতিকরা। দলীয় স্বার্থ বা মতামতের ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন সময় তারা, এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যরাও বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন।

 

ফেসবুকের কমিউনিটি গাইডলাইন

 

এ ধরনের পোস্ট ফেসবুকের কমিউনিটি গাইডলাইনের পরিপন্থি। যদিও ব্যবহারকারীরা এটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তবে ফেসবুকের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের পোস্ট, কমেন্ট বা শেয়ার করার কারণে তারা বিভিন্ন আইডি, পেজ ও গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।

 

ফেসবুকের মূল কোম্পানি ‘মেটা’ প্রতি বছর তাদের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড এনফোর্সমেন্ট রিপোর্ট প্রকাশ করে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে, বিদ্বেষমূলক বা আপত্তিকর কনটেন্টের কারণে ২০২৫ সালে প্রায় ৯০ লাখ কনটেন্ট সরানো হয়েছে। এর ৭০ ভাগেরও বেশি মেটা নিজেই শনাক্ত করেছে। বাকি অংশ ব্যবহারকারীদের রিপোর্টের মাধ্যমে শনাক্ত হয়েছে।

 

সমাধান কোন পথে?

 

বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট সরানোর কাজটি এখনও ম্যানুয়ালি করছে মেটা। তবে এখনকার অপরাধের ধরনের তুলনায় এটি অপ্রতুল বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘হেট স্পিচ যুক্ত কনটেন্টগুলো এখন মূলত বটের মাধ্যমে করা হচ্ছে। তাই এগুলো শনাক্ত করতে ফেসবুককে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে কিন্তু এই কাজটি ফেসবুক এখনও ম্যানুয়ালি করছে। এটাকে যদি অটোমেটেড কোনো উপায়ে করা যায়, তাহলে আরও কার্যকর ফল পাওয়া যাবে।’

 

গঠনমূলক সমালোচনা এবং বিদ্বেষমূলক মন্তব্যকে আলাদা করার জন্য নতুন সংজ্ঞায়নের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, ‘এই দুটির মধ্যে পার্থক্য খুবই সূক্ষ্ম। তাই নতুন সরকারের উচিত হবে গঠনমূলক সমালোচনা এবং বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা।’

 

যা বলছেন বিশেষজ্ঞ

 

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের সঙ্গে। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টকে আলোচনায় আনতে অধিক মাত্রায় বিদ্বেষমূলক উপাদান যুক্ত করা হয়।

 

ড. তৌহিদুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমাদের দেশে একেক সময় একেকভাবে ব্যবহার ও অপব্যবহার, দুটোই করা হয়েছে। মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, যা খুশি বলে দেব।’

 

দেশের সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, সৌজন্যমূলক ও শিষ্টাচার অন্তর্ভুক্তমূলক মতামত প্রকাশ করলে বেশিরভাগ মহলে সেটি আমলে নেওয়া হয় না। ভয়ের জায়গাটা এখানে। কেউ যখন ভদ্রোচিতভাবে তার মতামত প্রকাশ করে, তখন এটি গুরুত্ব পায় না। যখনই সেখানে গালমন্দ বা আপত্তিকর শব্দ থাকে, তখন সেটির কদর বাড়ে।’

 

সামাজিক ও জাতিগত আচরণের ক্ষেত্রে সুস্থতার দৃষ্টান্ত স্থাপনে ব্যর্থতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, ‘জাতিগত বা সামাজিকভাবে আমাদের আচরণের জায়গাটাতে সামগ্রিকভাবে সুস্থতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারছি না।’ তার মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে বিদ্বেষমূলক আচরণের মাধ্যমে যারা আজ সুবিধা নিচ্ছেন, ভবিষ্যতে তারাই আবার অপদস্থ হবেন।