Image description

পরিবার পরিকল্পনায় গর্ব করার মতো ঈর্ষণীয় জাতীয় সাফল্য এখন ম্লান হওয়ার পথে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অবহেলা, অমনোযোগ ও গাছাড়া ভাবে পুরো জন্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তথা পরিবার পরিকল্পনায় ‘লাল বাতি’র দশা। জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল কিংবা কনডমসহ বিভিন্ন উপকরণের স্টক প্রায় ফুরিয়ে এখন তা চরম ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে এসে ঠেকেছে। খোদ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালের (এসসিএমপি) মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে দেশের প্রতিটি উপজেলায় এসব উপকরণের স্থলে ‘লাল চিহ্ন’ দৃশ্যমান হয়ে রয়েছে; যার অর্থ, মাঠ পর্যায়ে প্রায় সব উপজেলায় কনডম, বড়ি, ইমপ্লান্ট, আইইউডির মজুদ প্রায় শূন্যের কোঠায়।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (উপকরণ ও সরবরাহ) মো. আবদুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে ‘লাল’ হয়ে থাকার অর্থ হলো মজুদ নেই বা মজুদ তিন মাসের কম। আর ‘হলুদ’ সংকেত নির্দেশ করে মজুদ তিন থেকে সাড়ে পাঁচ মাস পর্যন্ত রয়েছে। ছয় মাসের বেশি মজুদ থাকলে সংকেত হবে ‘সবুজ’।

তিনি জানান, কবে থেকে এই সংকট চলছে সেটিও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালে দেখা যায়।

এই কর্মকর্তার কথা মতো কনসাম্পশন ট্রেন্ড বা সরবরাহের অবস্থা দেখতে এসসিএমপির মনিটরিং ড্যাশবোর্ডে গিয়ে দেখা যায়, দেড় বছর ধরে এই সংকট তীব্র হয়েছে, যা অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের অর্জিত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সাফল্য হারাতে বসেছে। অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও নিরাপদ মাতৃত্ব ব্যাহত হতে পারে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় কনডম নেই ৩৯৪ উপজেলায়।

৩৩৭ উপজেলায় নেই কোনো ওরাল পিল। ইমার্জেন্সি পিল (ইসিপি) অনুপস্থিত ৪৬৮ উপজেলায়, তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য গর্ভনিরোধ সুরক্ষায় ব্যবহৃত ইমপ্লান্ট নেই ৩৫৮ উপজেলায়। ১০ বছরের জন্য কার্যকর পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি আইইউডি শেষ হয়েছে ৩৯২ উপজেলায়। এ ছাড়া ইনজেকশনের মজুদ ফুরিয়েছে ২৭১ উপজেলায়। শুধু জন্ম নিয়ন্ত্রণ নয়, মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি উপকরণ মিসোপ্রোস্টল, অক্সিটোসিন, আয়রন-ফলিক এসিড, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট—এসবও প্রায় সব উপজেলায় মজুদশূন্য।

গত ২০ এপ্রিল রাত পর্যন্ত এসসিএমপির মনিটরিং ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কনডম রয়েছে ১৭ লাখ ৯৫ হাজার, যা সর্বোচ্চ ৩৬ দিনের মজুদ। ওরাল পিল বা বড়ি আছে ২৯ লাখ ৬৩ হাজার, যা সর্বোচ্চ ৪০ দিন চলতে পারে। আইইডি মজুদ রয়েছে ১৬ হাজার, যা দিয়ে দুই মাস চলা যাবে। ইনজেকশন রয়েছে ১০ লাখ ১৩ হাজার, যা মাত্র দুই মাসের মজুদ। ইমপ্লান্টের মজুদ শূন্য। 

লাল সংকেত কেন দীর্ঘায়িত হলো?

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও মাতৃস্বাস্থ্যের জরুরি উপকরণ কেনা হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে হঠাৎ ওপি বন্ধ করে দেয়। এরপর নতুন প্রকল্প দলিল তৈরি, প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থ ছাড়—সবকিছুতেই বিলম্ব হয়।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) মহাপরিচালক আশরাফী আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০২৩ সালের শেষের দিকে তৎকালীন সচিব মো. আজিজুর রহমান একটি বড় কেনাকাটার অনুমতি না দেওয়ায় সমস্যার সূত্রপাত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের জুনে ‘অপারেশন প্ল্যান’ (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেনাকাটা পুরোপুরি বাধাগ্রস্ত হয়। ২০২৫ সালে এই সংকট তীব্র হতে থাকে।

আশরাফী আহমদ বলেন, একটি প্রকিউরমেন্ট সাইকেল সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ১২০ দিন সময় লাগে, যা সময়মতো শুরু করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে রাজস্ব খাতের তহবিল থেকে যতটুকু সম্ভব সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী মে মাসের মধ্যেই কনডম, পিলসহ প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো চলে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিটের ফোকাল পারসন ডা. মনজুর আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দুই বছর ধরে কোনো নতুন সামগ্রী কেনা হয়নি এবং কোনো বড় বরাদ্দও পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে পণ্য কিনতে কমপক্ষে তিন-চার মাস সময় লাগে, যা বর্তমানে চলমান ঘাটতিকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। এমনকি জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিলেও সরকারি নিয়ম মেনে পণ্য হাতে পেতে দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগবে।

সরবরাহব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে ডা. মনজুর বলেন, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালে ঢুকলে দেখা যাবে সবকিছু এখন ‘লাল’ হয়ে আছে, যার অর্থ মজুদে এক ভয়াবহ শূন্যতা বিরাজ করছে। পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর জন্য যেখানে অন্তত ছয় মাসের ‘বাফার স্টক’ থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে বর্তমানে বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্লান্ট ও আইইউডির মতো অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর কোনো সংগ্রহই নেই। তিনি বলেন, ‘সহজ কথা বলে দিই, আপনি খালি দুটি অক্ষর লিখুন, সব লাল।’

ওপি বন্ধের ফলে সৃষ্ট এই শূন্যতা কেবল সেবারই ক্ষতি করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। ডা. মনজুরের মতে, সরবরাহব্যবস্থায় এক মাসের বিঘ্ন ঘটা মানে বিশাল বিনিয়োগ হারানো। এক ডলারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া মানে ইনভেস্টমেন্টে আমাদের ১৪ ডলারের লোকসান গ্রহণ করা। অথচ নীতিনির্ধারকদের অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে আজ এই জাতীয় ক্ষতি অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবসেবা বৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা সরকারের রয়েছে, তা-ও এখন অনিশ্চিত। কারণ হিসেবে তিনি জানান, সেবার জন্য দক্ষ জনবল (মিডওয়াইফ) নিয়োগের প্রক্রিয়াগুলোও এই প্রশাসনিক রদবদলের কারণে সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না।

বাংলাদেশ কি উল্টো পথে হাঁটছে?

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮১ সালে দেশে নারীদের মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) ছিল ৫.০৭। ১৯৯৪ সালে তা কমে হয় ৩। ২০১২ সালে ছিল ২.৩। এই হার ২০২২ সাল পর্যন্ত একই থাকে। সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ যৌথভাবে মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫ প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, টিএফআর বেড়ে ২.৪ হয়েছে।  

এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে জন্মনিরোধক সামগ্রীর সংকটের সঙ্গে প্রজনন হার বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সরকারি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তাই সরবরাহ কমে যাওয়া জন্ম নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে ব্যাহত করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, দেশে জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার কমে যাওয়া এবং প্রজনন হার বৃদ্ধি—এই দুই প্রবণতাই স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে তৃণমূল পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি ঠিকমতো কার্যকর নেই।

তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, জন্মনিরোধক সরবরাহ চলমানে এই বিঘ্ন সবচেয়ে বেশি আঘাত হানবে নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর। কারণ তাদের অনেকেরই বাজার থেকে এসব সামগ্রী কিনে ব্যবহারের আর্থিক সামর্থ্য নেই। এর ফলে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়বে।

অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম আরো সতর্ক করে বলেন, যদি এই সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা দেশের প্রজনন হার বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে বাংলাদেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পথও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে একটা বড় বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গেছে। ওই সময় হঠাৎ অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ করে দেওয়ার ফলে ওপির অধীনে যে কর্মকাণ্ডগুলো ছিল সেগুলো মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ফ্যামিলি প্ল্যানিংও আছে।’

‘এটা খুবই দুঃখজনক! দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে এই পর্যায়ে আসা গিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু হঠকারী ও খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিনের অর্জিত এই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মাঠ পর্যায়ের পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের সঙ্গে সেবাগ্রহীতাদের যে সংযোগ ছিল, তা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ তিনি যোগ করে বলেন, ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ না থাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপদ পদ্ধতিতে গর্ভপাত করানোর প্রবণতা বাড়তে পারে, যা নারীদের স্বাস্থ্য ও জীবনের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।’ 

মাঠ পর্যায়ে কর্মরত ব্যক্তিরা কী বলছেন

বর্তমানে দেশে প্রায় দুই কোটি ৮১ লাখ ৭৭ হাজার ৪০৩ জন সক্ষম দম্পতি রয়েছেন, যাঁরা এই সরকারি সেবার ওপর নির্ভরশীল। গ্রামাঞ্চলে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে মানুষকে পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেন পরিবারকল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউভি)। সারা দেশে এঁদের পদ আছে সাড়ে ২৩ হাজার।

দেশের বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত পরিবারকল্যাণ সহকারী কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় কালের কণ্ঠের এই প্রতিবেদকের। এঁদের একজন ঝরনা আক্তার। তিনি কাজ করছেন শরীয়তপুরের জাজিরায়।

ঝরনা বলেন, ‘কনডম ও বড়ির চাহিদা অনেক বেশি থাকলেও সরবরাহ নেই অনেক দিন। আমাদের বলতে হয় দোকান থেকে আপাতত কিনে নিতে। এলে ফোন করে জানানো হবে। এ জন্য ফোন নম্বরও রেখে দিই।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোবরাতলা ইউনিয়নে কর্মরত তাজরেমীন খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন এমন পরিস্থিতি যে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না থাকায় গর্ভবতী মায়ের সেবা নিয়ে বেশি কাজ করতে হচ্ছে। যাঁরা জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী নিতে আসেন তাঁদের ফার্মেসি থেকে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি আমরা।’

নেত্রকোনার আরেক পরিবারকল্যাণ সহকারী পপি আক্তার বলেন, ‘আসলে শুধু নেই বলছি না, অনেক সময় দোকান থেকে কিনে নেওয়ার পরামর্শ দিই। কিন্তু বেশির ভাগ নারীর অভিযোগ তাঁদের স্বামীরা কিনতে চান না। যখন আসে তখন প্রথমে গরিব মানুষকে আগে দেওয়ার চেষ্টা করি। এখন তো নেই, দেব কোথা থেকে?’

ঝিনাইদহ উপজেলার উপপরিচালক মোজাম্মেল করিমের কাছে সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে কথা বলতে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। তিনি শুধু বলেন, ‘এ সংকট সারা দেশেই রয়েছে, শুধু আমার এখানে নয়।’ 

মানবেতর জীবনযাপন ২৮২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর

চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রামের অধীন ২৮২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের টানা ২২ মাস ধরে বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ার মুখে। মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম সচল রাখতে গিয়ে অফিস ব্যয়, জ্বালানি খরচ, গাড়ি মেরামত—সবখানেই জমেছে বকেয়া। ফলে শুধু কর্মচারীদের ব্যক্তিজীবন নয়, পুরো সেবাব্যবস্থাই এখন পড়েছে চাপের মুখে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মানবেতর জীবন যাপন করছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গেলে উনাদের শুধু আশ্বাস, দু-এক মাসের মধ্যে সমাধান হবে। সরকারি গাড়িতে করে উপকরণ বিভিন্ন ওয়ারহাউসে পৌঁছে দিতে হয়, বিভিন্ন গ্যারেজে এসব গাড়ির মেরামত বাবদ টাকা বকেয়া পড়েছে। এ ছাড়া নির্ধারিত কিছু তেলের পাম্প রয়েছে, যেখান থেকে এসব গাড়ি জ্বালানি নিয়ে থাকে। সেখানেও ২২ মাস ধরে যার যার অফিসের অনুকূলে বাকি রয়েছে। এ ছাড়া লেবার খরচ ও বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। এখন উনারা আমাদের নামে মামলা দিতে চায়, ভয় দেখায়।’

সম্প্রতি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এসংক্রান্ত চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়কে, যা কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচি সমাপ্তির পর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরাধীন অপারেশন প্ল্যানে (ওপি) কর্মরত জনবলের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য খাতের (যানবাহনের জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি, ইউটিলিটি বিল, অফিসভাড়া, ডিজিটাল সেবা ইত্যাদি) বকেয়া বিল পরিশোধ বাবদ সর্বমোট ৫০ কোটি ৯৪ লাখ ৭২ হাজার টাকার চাহিদা প্রেরণ করা হয়েছে। 

আছে জনবলসংকটও

অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বলছে, কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে পদ আছে ৫৪ হাজার ২২৬টি। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৯৮১টি পদে কোনো লোক নেই। অর্থাৎ প্রায় ২৮ শতাংশ পদ খালি। মাঠ পর্যায়ে পদ খালি থাকলে মানুষ পরিবার পরিকল্পনা সেবা পায় না।

গ্রামাঞ্চলে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বা কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে মানুষকে পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেন পরিবারকল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউভি)। সারা দেশে এঁদের পদ আছে সাড়ে ২৩ হাজার। এর মধ্যে চার হাজার ১৮৮টি পদ খালি। এর অর্থ ১৮ শতাংশ এলাকায় মাঠ পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়ার জনবল নেই।

পরিবারকল্যাণ সহকারীদের কাজের সমন্বয় ও নজরদারি করেন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক। এঁদের পদ আছে সাড়ে চার হাজার, প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে। এ রকম ৩৭৩টি ইউনিয়নে এই পদে কর্মী নেই। এসব ইউনিয়নে পরিবারকল্যাণ সহকারী থাকলেও তাঁদের কাজের ওপর কারো নজরদারি নেই।

এ ছাড়া সারা দেশে আড়াই হাজার ইউনিয়ন ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে একটি করে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট মেডিক্যাল অফিসারের (সাকমো) পদ আছে। ৮৭৮টি কেন্দ্রে অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ সাকমোর পদ শূন্য পড়ে আছে।

সারা দেশে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শক বা ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটরের (এফডব্লিউভি) পদ আছে ছয় হাজার ৩৬১টি। এর মধ্যে দুই হাজার ৮৪৫টি পদ খালি পড়ে আছে। অর্থাৎ ৪৫ শতাংশ পদে কোনো মানুষ নেই।

পরিবারকল্যাণ সহকারী, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, সাকমো ও পরিবারকল্যাণ পরিদর্শক—মাঠ পর্যায়ে সেবার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এই চার ধরনের কর্মী। দেখা যাচ্ছে, সব মিলিয়ে আট হাজার ২৯৩টি পদ খালি।