দেশের প্রধানতম হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ঝুঁকিতে আছে। উড্ডয়ন-অবতরণের মতো সংবেদনশীল এলাকায় জমে আছে ময়লা, বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ধ্বংসাবশেষ ও বিপজ্জনক ফরেন অবজেক্ট। অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে বিমানবন্দরের সবকটি সুইপার (রানওয়ে পরিষ্কার করার মেশিন)। ফলে ময়লা-আবর্জনা আর ফরেন অবজেক্টের (বিমানের পার্টসের ধ্বংসাবশেষ) বাগাড়ে পরিণত হয়েছে রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়েসহ অ্যাপ্রোন এলাকা। শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ে পরিষ্কারের জন্য তিনটি সুইপার গাড়ির মধ্যে প্রায় ১০ বছর ধরে দুটি নষ্ট। সর্বশেষ সুইপারটিও অচল হয় ৬ মাসের বেশি সময় ধরে। এর ফলে এয়ারক্রাফট মুভমেন্ট এলাকা পরিষ্কার রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে উড়োজাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগিব সামাদ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সর্বশেষ যে সুইপার মেশিনটি ছিল সেটিও বর্তমানে অকেজো। এ পরিস্থিতিতে রানওয়ে পরিষ্কার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নতুন সুইপার মেশিন ক্রয়ের জন্য ইতোমধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার এটিএম নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রানওয়ে সুইপার মেশিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতারই প্রতিফলন। এতে যে কোনো সময় উড়োজাহাজের ইঞ্জিন বিকল হওয়া কিংবা টায়ার ফেটে যাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যা আইকাওর নির্ধারিত নিরাপত্তা মানদণ্ডের পরিপন্থি। তিনি আরও বলেন, এত বড় রানওয়ে ম্যানুয়ালি বা দায়সারাভাবে পরিষ্কার করা হলে তা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত তিনটি সুইপার গাড়ির মধ্যে সবকটিই অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে রানওয়ে সুইপার এলজিন (মডেল নং-০৮২৫কে) ২০০৬ সালের ১৬ মার্চ কেনা হয়। ১০ বছর চলার পর ২০১৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে এটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। একই বছরের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্লোয়ার-বেজড দ্বিতীয় সুইপার গাড়ি (মডেল নং-সিআর-৪৫০ডি) কেনা হয়। এরপর মাত্র ৮ মাস যেতে না যেতেই সেটিও পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। জোড়াতালি ও স্পেয়ার পার্টস দিয়েও সেটি আর সচল করা সম্ভব হয়নি। এর আগে ২০১৫ সালে ইতালি থেকে তৃতীয় রানওয়ে সুইপার (আরএস-৪) গাড়ি কেনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কেনার পর থেকেই গাড়িটি বেশির ভাগ সময় নষ্ট থাকত। এটি সচল রাখতে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা খরচ করা হয়। শেষ ভরসা হিসাবে কোনো রকমে কাজ চালানো হচ্ছিল। টানা ব্যবহারের কারণে এই গাড়িটিও গত বছরের ৩০ নভেম্বর পুরোপুরি অচল হয়ে যায়। এর ফলে গত ৬ মাস ধরে রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকা থেকে পাথর, ধাতব টুকরো বা অন্যান্য আবর্জনা অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। গুরুত্বপূর্ণ এই যন্ত্রগুলো দীর্ঘদিন অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকলেও যেন দেখার কেউ নেই। বর্তমানে ম্যানুয়ালি ঝাড়ু দিয়ে রানওয়ে পরিষ্কারের কাজ চালানো হচ্ছে। ফলে পুরো বিমানবন্দরের অপারেশনাল নিরাপত্তা বাজে রকমের হুমকির মাঝে আছে। এমন পরিস্থিতিতে ৯ এপ্রিল বর্তমান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ বেবিচক চেয়ারম্যানকে একটি জরুরি চিঠি দেন।
যুগান্তরের হাতে আসা চিঠিতে দেখা যায়, নবনির্মিত থার্ড টার্মিনালের রানওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকার পরিধি কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই বাড়তি দায়িত্ব সামাল দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, যেখানে অতিরিক্ত মেশিন সংযোজনের প্রয়োজন ছিল, সেখানে বিদ্যমান একমাত্র রানওয়ে সুইপার মেশিনটিও বর্তমানে অকেজো। এতে পুরো বিমানবন্দরের এয়ারক্রাফট মুভমেন্ট এলাকা কার্যকরভাবে পরিষ্কার রাখা সম্ভব হচ্ছে না। যা সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচলের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে জরুরি ভিত্তিতে দুটি নতুন রানওয়ে সুইপার মেশিন কেনার আবেদন জানিয়েছেন। চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে উল্লেখ করেছেন, বর্তমান অবস্থায় রানওয়ে ও সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিষ্কার রাখা সম্ভব না হওয়ায় উড়োজাহাজের নিরাপদ উঠানামা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্রমতে, এর আগে ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর শাহজালালের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম জরুরি ভিত্তিতে দুটি অত্যাধুনিক সুইপার গাড়ি কিনতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) চিঠি দেন। তবে তা কার্যকর হয়নি। তখন বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অরগানাইজেশনকে (আইকাও) চিঠি দিলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি।
শাহজালালের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সরঞ্জাম কেনাকাটায় কেন ৩ বছর সময় লাগে? বেবিচকের অভ্যন্তরীণ কোনো চক্র কি ইচ্ছা করেই এই ফাইল আটকে রেখেছে নাকি বিশেষ কোনো কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া বারবার বিলম্বিত করা হচ্ছে-সে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রানওয়েতে পড়ে থাকা সামান্য কোনো ধাতব টুকরো বা পাথরও একটি বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। রানওয়ে পরিষ্কারের কাজটি খুবই টেকনিক্যাল ও দুরূহ। একটি এয়ারক্রাফট যখন রানওয়েতে অবতরণ করে তখন তার প্রতিটি টায়ার রানওয়েতে ১.৫ পাউন্ড পর্যন্ত কালো রাবার ছেড়ে দেয়। একটি এয়ারবাসের (এ-৩৮০) ২২টি চাকা থাকে। অবতরণের সময় ঘর্ষণে এসব চাকার রাবার রানওয়ের পৃষ্ঠকে কালো ও মসৃণ করে তোলে। রানওয়েতে থাকা বিভিন্ন লাইনের সাদা বা বিভিন্ন কালারের দাগগুলোকে ঢেকে দেয়, যা একটি ফ্লাইটের নিরাপদ অবতরণের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এসব রাবার ম্যানুয়ালি ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করা অসম্ভব। এজন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত সুইপার গাড়ি ও গরম পানি স্প্রে প্রযুক্তি। রানওয়ের চলমান পরিস্থিতিকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তারা বলছেন, একটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০-ইআর এয়ারক্রাফটের দাম ১২শ থেকে ১৫শ কোটি টাকা। যা ঝুঁকিপূর্ণ রানওয়ের কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
আইকাওর বিধি অনুযায়ী, রানওয়ে সব সময় স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে পরিষ্কার রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ম উপেক্ষিত হচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।