ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে-এমন পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকাররা। তাদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। যতটা কঠোর হওয়া যায়, ততটা হতে হবে। নইলে ব্যাংক খাতকে বাঁচানো কঠিন হবে। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেক ব্যাংক কোনো-না-কোনোভাবে রোগাক্রান্ত। তিন ভাগের এক ভাগ ব্যাংক প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে।
জানতে চাইলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিগত ১৭ বছর বাধাহীনভাবে ব্যবসা করেছে এমন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান যারা এখন ঋণখেলাপি, খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে এদের অধিকাংশ ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। সঠিক বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির বিষয়ে কঠোর হতে হবে। যতটা কঠোর হওয়া যায়, হতে হবে। নইলে ব্যাংক খাত বাঁচানো যাবে না। শুনেছি চীন-ভিয়েতনামে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, শুনতে যতই খারাপ লাগুক, প্রয়োজনে সেই পথেও হাঁটতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কিছুই হবে না। এ নিয়ে আর কথা বলে লাভ নেই।
জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার মোহাম্মদ নুরুল আমিন যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় যেসব ব্যাংক দিয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার, সেসব ব্যাংকের বেশির ভাগের অবস্থা খুবই নাজুক। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণও বেশি। বর্তমানেও লক্ষণ ভালো দেখা যাচ্ছে না। নতুন বাংলাদেশে পুরোনো চিত্র চলবে না। রাজনীতি থেকে ব্যাংক খাত আলাদা করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
খেলাপি ঋণের তথ্য : ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থিতিভিত্তিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বর্তমান সংসদ-সদস্য ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিতে মোট ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আদালতের নির্দেশনা অনুসারে (খেলাপি ঋণ) ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসাবে দেখানো হয়নি।
উচ্চ ঋণখেলাপির কারণে বাড়ছে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি : এদিকে উচ্চ ঋণখেলাপির কারণে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ বেড়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে ২৩ ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে এসব ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। এতে অধিকাংশ ব্যাংক দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সময় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণের নামে বিপুল অঙ্কের টাকা বের করে নেওয়া হয়। এসব ঋণ খেলাপি হলেও সে সময় তা হিসাব করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় লুকানো খেলাপি ঋণ ধীরে ধীরে সামনে আসতে থাকে।
এতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। খেলাপির বিপরীতে যে পরিমাণ নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখার দরকার ছিল, তাও রাখতে পারেনি এ ব্যাংকগুলো। এ সময় প্রভিশন ঘাটতি হয় ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। বিপুল প্রভিশন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মূলধন ঝুঁকিজনিত সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক হয়েছে ২ দশমিক ৯০ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক কাঠামো অনুযায়ী ন্যূনতম ১০ শতাংশ থাকা উচিত। গত জুন শেষে সিআরএআর ইতিবাচক ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। সিআরএআর হচ্ছে একটি ব্যাংকের মূলধন ও তার ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত, যেখানে ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সম্পদের হিসাব নির্ধারণ করা হয়।
প্রসঙ্গত, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলনে রোববার অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেছেন, ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে। সংস্কারের পথে তারা নিজেরাই বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে সমস্যাটি ব্যক্তিনির্ভর নয়, বরং কাঠামোগত। আর সংস্কার মানে শুধু আইন প্রণয়ন নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, প্রথমে আইন হবে, তারপর তা বাস্তবায়নের জন্য হবে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো। এরপর হবে আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সবশেষে ফলাফল মূল্যায়ন।