Image description
অধ্যাদেশ বাতিল নিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত

পুলিশকে সর্বোচ্চ পেশাদার ও সেবাধর্মী বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলা দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। কিন্তু কোনো সরকারই তা বাস্তবায়ন করেনি। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশের সংস্কার নিয়ে মুখে যা বলে, বাস্তবে তা চায় না। কারণ, সবাই নিজেদের প্রয়োজনে পুলিশকে চূড়ান্তভাবে ব্যবহার করতে চায়। ক্ষমতা ভোগ করার প্রশ্নে কেউ পুলিশকে ব্যবহারের এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। ফলে পুলিশ অধ্যাদেশ হুবহু পাশ করেনি সরকার। যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে এই সেক্টরের বিশেষজ্ঞরা এসব মন্তব্য করেন। তাদের মতে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাইলে সরকারের নির্দেশে নয়, পুলিশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে-এটি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার নিয়ে এ ধরনের টালবাহানা অশনিসংকেত। তবে তারা এও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে পুলিশের জন্য অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তা পরিপূর্ণ ছিল না। অধ্যাদেশটি এক ধরনের দায়সারা গোছের। এটি মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ ছিল না। ফলে গণতান্ত্রিক সরকারকে অবশ্যই মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতি রেখে অধ্যাদেশটিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে আইনে রূপ দিতে হবে।

জানতে চাইলে অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ যে কারণে বারবার বিতর্কিত হচ্ছে, সেই কারণগুলো সমাধানের জন্য সংস্কার প্রয়োজন। শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই এই আলাপটা হয়েছে বা অধ্যাদেশ হয়েছে-ব্যাপারটা এরকম নয়। এর আগেও বহুবার পুলিশের সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ হয়েছে। কিন্তু মূল বিষয় হলো-পুলিশের সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মুখে যা বলে, বাস্তবে তা চায় না। কারণ, নিজেদের প্রয়োজনে সবাই পুলিশকে চূড়ান্তভাবে ব্যবহার করতে চায়। ক্ষমতার প্রশ্নে কেউ এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। তিনি বলেন, আমরা চাই পুলিশ সরকারের নির্দেশে নয়, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। কারণ, নির্দেশে কাজ করতে গেলেই বিতর্কিত হতে হবে। এতে পুলিশের সঙ্গে দেশের মানুষের আরও দূরত্ব তৈরি হবে। আমরা চাই এই বিতর্কের অবশ্যই অবসান হোক।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় যে পরিবর্তন বা সংশোধন দরকার, সেগুলোর ক্ষেত্রে আরও পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ, আইন যে কোনো সরকার করতে পারে। কিন্তু সেটা কার্যকর না হলে পুলিশের বিরুদ্ধে থাকা দীর্ঘদিনের অভিযোগের সমাধান হবে না। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ করেছে, সেগুলোও পরিপূর্ণ মনে হয়নি। ফলে দেশের বাস্তবতার আলোকে অধ্যাদেশটি আরও ব্যাপক পরিসরে পর্যালোচনা করে তৈরি করতে হবে।

প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১৩টিকে আইনে রূপ দিয়েছে বিএনপি সরকার। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে বাকি ২০টি ইতোমধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। বাতিলের তালিকায় পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ অন্যতম। তবে বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ৪টি বাদ এবং ১৬টি আরও সংশোধন করে নতুনভাবে আইনে রূপ দেওয়ার কথা বলছে সরকার। কিন্তু সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না সংসদে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে তারা রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

জুলাই অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ছিল পুলিশের বিরুদ্ধে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ সংস্কারের বিষয়টি সবার আগে সামনে আসে। এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে পুলিশ সংস্কারে বেশকিছু শক্তিশালী ধারা যুক্ত করা হয়। অধ্যাদেশে বলা হয়, পুলিশের জন্য আলাদা একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হবে। পুলিশের সব নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি আর সরকারের হাতে থাকবে না। আইজিপি নিয়োগ হবে এই স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে। বর্তমানে পুলিশের বিরুদ্ধে যে কোনো অভিযোগ এলে পুলিশই তা তদন্ত করে। কিন্তু অধ্যাদেশে বলা হয়েছে-পুলিশ বাহিনীর যে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তি করবে এই কমিশন। এছাড়াও পুলিশের ওপর রাজনৈতিক ও আমলাতন্ত্রের প্রভাব কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। অধ্যাদেশে পুলিশের প্রশিক্ষণ, বেতন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়কেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে সরকার এই অধ্যাদেশ বিবেচনায় নেয়নি।

জানতে চাইলে সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়েছে, এগুলোই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার ব্যাপারে সরকারের এই অনীহা এবং সংস্কারের টালবাহানা একটি অশনিসংকেত। তিনি বলেন, সরকার বলছে, তারা এগুলো পরবর্তী সময়ে উত্থাপন করবে। কিন্তু কবে এবং কী রকম পরিবর্তন করবে, তা নিশ্চিত নয়। তার মতে, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনের সীমাবদ্ধতাই শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারে পরিণত করেছিল। এগুলো অব্যাহত থাকলে পরবর্তী সরকারেরও স্বৈরাচারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এদিকে অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার পর এ নিয়ে সংসদে কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলে সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করে এর ব্যাখা দেন তারা। এতে বলা হয়, সরকার স্পষ্ট করে বলছে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুসারে অধ্যাদেশগুলো আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করে আইনে রূপ দেবে। তারা বলেন, এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য ও পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজি মো. গোলাম রসুল যুগান্তরকে বলেন, সরকার বলছে অধ্যাদেশ সংশোধন করে পাশ করবে। এটাও একটা কমিটমেন্ট। যেহেতু সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাই আমাদের অপেক্ষা করা উচিত। সংশোধন প্রক্রিয়ায়ও নিশ্চয়ই আমরা কথা বলার সুযোগ পাব। তিনি বলেন, এই অধ্যাদেশ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে যে মিটিং হয়েছিল, তখন বিএনপিসহ ৫০টি দল সংস্কারের পক্ষে স্বাক্ষর করেছে। যেহেতু বিএনপি স্বাক্ষর করেছে, ফলে আমি আশাবাদী তারা এই অধ্যাদেশ আইন আকারে পাশ করবেন।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছে, সেটা এক ধরনের দায়সারা গোছের। এই দায়সারা কাজ পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, জনগণ, সুশীল সমাজ এবং বুদ্ধিজীবীসহ কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। পুলিশকে পেশাদার বাহিনী হিসাবে গড়ে তুলতে জনগণ এবং পুলিশেরও দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। কিন্তু নতুন অধ্যাদেশটি তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না। এছাড়া অধ্যাদেশটিতে বিভিন্ন দেশে আদর্শ পুলিশের যে মডেল আছে, তা অনুসরণ করা হয়নি। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার এসেছে। তাই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ যেন উৎকৃষ্ট সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠতে পারে, তেমনটাই প্রত্যাশা করছি।

এদিকে গণভোটের রায় অনুসারে সংস্কার বাস্তবায়ন এবং বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপ দেওয়ার দাবিতে জোটবদ্ধভাবে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে সংসদে বিরোধী দল। এই জোটে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন ১১ দল রয়েছে। প্রথম দফায় ইতোমধ্যে ৭ দিনের কর্মসূচি শেষে নতুনভাবে ১৫ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গণমিছিল, লিফলেট বিতরণ এবং সেমিনার অন্যতম। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে আন্দোলন জোরদারের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। জোটের নেতারা বলছেন, জনগণের রায় এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুসারে সরকার সংস্কার বাস্তবায়ন করছে না। এর মাধ্যমে তারা জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করছে।