দেশের মানুষের খাদ্যের প্রধান উৎস চাল। ধান চাষির কষ্টার্জিত ফসলে মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ হলেও বঞ্চিত থেকে যান তাঁরা। ক্রমাগত উৎপাদন খরচ বাড়লেও প্রতি বছর কোনো না কোনো কারণে কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পান না। বরং সিন্ডিকেটের কারণে ঋণগ্রস্ত কৃষক আরও নিঃস্ব হন। তবে এবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বোরো চাষির খরচ আরও বেড়েছে। চলমান সংকটের সমাধান না হলে আগামীতে খাদ্যসংকট প্রকট হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ কৃষিযন্ত্র ডিজেলচালিত। জ্বালানির দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই এবার উৎপাদন খরচ বাড়বে। তা ছাড়া গ্যাসসংকটের কারণে ইতোমধ্যে ফার্টিলাইজার-সংকটে রয়েছি। ফলে
৭-১০ শতাংশ উৎপাদন কমবে এবার। ইউএসএইড দেশের খাদ্য উৎপাদন কমবে বলে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে। চলমান সংকট সমাধানে টার্গেটেড কৃষককে তেল সরবরাহ ও নগদ সহায়তা দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।’ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) দেওয়া ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। এ ছাড়া তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকা বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে আছে বাংলাদেশ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বোরো মৌসুমের শেষভাগ চলছে। কিছু কিছু এলাকায় ধান কাটার উৎসব শুরু হলেও সিংহভাগ এলাকায় মাঠে রয়েছে বোরো ধান। এসব ধানে কমপক্ষে আরও দুটি সেচের প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি বোরো ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনে এবারে খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলসংকটের শুরুর দিকে যেসব কৃষকের সেচ দিতে হয়েছে তারা অতিরিক্ত দাম পরিশোধ করেছেন। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়লেও উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে খরচ না ওঠার আশঙ্কা করছেন বোরো চাষিরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক বছরে ক্রমাগত চালের আমদানি বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৩৪ টন চাল আমদানি করা হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫ লাখ ৩৩ হাজার ১০৬ টন চাল আমদানি করা হয়। পরে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও ২ লাখ টন বাড়িয়ে চাল আমদানি করা হয় ৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪০৯ টন।
লক্ষ্মীপুরের কৃষক রব মুন্সি বলেন, ‘তিন বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছি। ডিজেলসংকটে বিঘাপ্রতি ৫০০ টাকা বেড়ে আড়াই হাজার টাকা দিতে হয়েছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় এখন আরও বেশি খরচ হবে। কাটা, মাড়াইয়ের খরচ এখনো বাকি আছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, গত বছর যেখানে বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ১৬ হাজার টাকা, এবার সেখানে ৪ হাজার বেড়ে খরচ হবে ২০ হাজার টাকা।’ হালুয়াঘাটের কৃষক সাইদুর। তিনি ২২ কাঠা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। নানান সংকটে ধানের আবাদ কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধান ঘরে তোলার আগেই শ্রমিক খরচ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এবারে সবকিছুর দাম বেশি। বীজতলা তৈরির সময় প্রতি কেজি বীজধান কিনতে হয়েছে ১৫০০ টাকায়, যা আগের বছর ৮০০ টাকায় কিনেছি। সময়জুড়ে শিলাবৃষ্টি থাকায় এবারে ধানের আবাদ কম হবে। তা ছাড়া ২২ কাঠা জমি মাড়াই করতে খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। দিনমজুর খরচ ৬০০ টাকা হলেও এবার তা বেড়ে হয়েছে ১২০০ টাকা। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ায় এবারে বিঘাপ্রতি খরচ বাড়বে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।’