Image description

একদিকে দেশজুড়ে গরমের তীব্রতা বৃদ্ধি, আরেক দিকে চলছে গ্যাস, কয়লা ও তেলের সংকট। পাশাপাশি কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ রয়েছে ৪০টির বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলে দেশজুড়ে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে। ঢাকার বাইরে অনেক জেলায় এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসছে। এ অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ অন্য শিক্ষার্থীরাও বিপাকে পড়েছে। কর্মজীবী মানুষের ভোগান্তিও এইসঙ্গে বেড়েছে। বিপদে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

দেশজুড়ে লোডশেডিং গতকাল প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে। সব মিলিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সামনে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে এবং জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে উঠতে পারে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগের মধ্যেই গতকাল গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়। এদিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহকারী একটি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটির কারণে ৪শ এমএমসিএফডি গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। এতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও আশপাশে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেয়। সিএনজি স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে দীর্ঘ গাড়ির লাইন। বাসাবাড়িতে চুলা জ্বালাতে পারেননি অনেক গৃহিণী। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, এ মুহূর্তে জ্বালানি সংকটের জন্য লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। বর্তমানে এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিট বন্ধ আছে এবং নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লি. (আরএনপিএল)-এর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কম লোডে চলছে। তবে আশা করা হচ্ছে, তিন-চার দিনের মধ্যে এসএস পাওয়ার এবং এই মাসের মধ্যে আরএনপিএল কর্তৃপক্ষ কয়লা আমদানি করে তাদের লোড বৃদ্ধি করতে পারবে। তখন ৯শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।

এদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কোনো উন্নতি নেই। এগুলো আগের মতোই আছে। সন্ধ্যায় গ্যাস থেকে এখন ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। আর তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সাড়ে তিন হাজার বিদ্যুৎ নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও সরকারের নির্দেশনায় ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য এখন পিক আওয়ারে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের ওপর বিদ্যুৎ নেওয়া হচ্ছে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আরও বিদ্যুৎ নেওয়া গেলে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ কিছুটা কমতো বলে মনে করা হচ্ছে।

বন্ধ ৪০টির বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র : বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে ১৩৬টি। কিন্তু জ্বালানিসংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এখন ৪০টির বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ আছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতাও কমে গেছে। বিদুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৮৮ শতাংশই তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। এ ছাড়া জ্বালানি সংকটে ৩৫টির বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে গেছে।

চট্টগ্রামে বন্ধ অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র : চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটি অঞ্চলে মোট ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও এর অধিকাংশই বন্ধ রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বর্তমানে মাত্র ১০-১২টি কেন্দ্র সচল থাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হচ্ছে। গতকাল দিনভর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিং হয়।

রংপুরে ঘন ঘন লোডশেডিং : রংপুর বিভাগে ৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন সক্ষমতা হারিয়ে বন্ধ আছে। জ্বালানিসংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি, উৎপাদন খরচ বেশি এসব কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো চালু রয়েছে সেসব সক্ষমতার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে। ফলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ছে।

অতিষ্ঠ বগুড়ার জনজীবন : ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বগুড়ার জনজীবন। চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় এমন ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। বগুড়ার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ঘনঘন বিদ্যুৎ যাওয়া আসা করছে।  দিনে চার থেকে পাঁচবার, আবার কোনো কোনো এলাকায় পাঁচ থেকে ছয়বারও বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। একটানা দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশিও লোডশেডিং হচ্ছে কোথাও। এতে কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মে চরম ব্যাঘাত ঘটছে। সিএনজি স্টেশনে চাপ, জ্বলছে না চুলা : একদিকে লোডশেডিং অন্যদিকে গ্যাসের সংকটে দুর্ভোগে পড়েছেন ঢাকার বাসিন্দারা। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহকারী ভাসমান টার্মিনালের একটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কারণে গতকাল গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়। এতে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

গ্যাসের অভাবে অনেক বাসাবাড়ির চুলা জ্বালাতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় গৃহিণীদের। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানায়, সমুদ্রে অবস্থানরত একটি এফএসআরইউ ইউনিটে হঠাৎ কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তিতাস গ্যাস অধিভুক্ত ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায়। তিতাস গ্যাসের গ্রাহকদের দিনে মোট চাহিদা ১৯শ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। সেখানে তিতাস দিনে ১৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পায়। এমনিতেই ৪শ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ঘাটতি থাকে। এর ওপর এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ আরও কমে যায়। ফলে গ্রাহকদের ভোগান্তিও বাড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, যাত্রাবাড়ী ও বাড্ডা এলাকায় গ্যাসের চাপ গতকাল একেবারেই কমে যায়।  গ্যাসের অভাবে ঢাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনগুলোতে প্রাইভেট কারের লাইন বৃদ্ধি পায়। গুলশানের এক বেসরকারি কোম্পানির গাড়িচালক আবদুর রহমান বলেন, এত দিন পেট্রোল পাম্পের লাইন বড় ছিল, কিন্তু আজ ঢাকার সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ কম থাকায় লাইন বেড়ে গেছে।  পেট্রোবাংলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুপুর ১২টায় এটি মেরামত করা হয়েছে। এতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।