Image description
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

হাতে বহির্বিভাগের টিকিট নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে দাঁড়িয়ে আছেন নাটোরের সুমন হোসেন। সুমন বলেন, ভাইয়ের ব্রেন টিউমার জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করা প্রয়োজন। আগারগাঁও নিউরোসায়েন্সস হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে শয্যা ফাঁকা না থাকায় ভর্তি নেয়নি, ঢাকা মেডিকেলে রেফার্ড করে দিয়েছে। এখানেও শয্যা ফাঁকা নেই। মেঝেতে রেখে হলেও তবু চিকিৎসা তো হবে এই আশায় দাঁড়িয়ে আছি। ভাই চোখে ঝাপসা দেখছে মাঝে মাঝে মানুষ চিনতে পারছে না।

নিউরোসার্জারি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মো. আশিক এহসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই বিভাগের ৩০০ শয্যায় বর্তমানে ৬২০ জন ভর্তি আছেন। চারটি অপারেশন থিয়েটারে ২৪ ঘণ্টা অপারেশন চলছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই বিভাগের ৭ হাজার সাতজন রোগীর অপারেশন করা হয়েছে। চিকিৎসক, রেসিডেন্ট চিকিৎসক, ইন্টার্নরা দিনরাত সেবা দিলেও এখনো অপারেশনের অপেক্ষায় আছে ৩০০-এর বেশি রোগী। অনেক সময় দেড় মাস-দুই মাস লেগে যায় সিরিয়াল আসতে। অপারেশন থিয়েটারের সংখ্যা বেশি হলে রোগীদের এত অপেক্ষা করতে হতো না।’

সুমন হোসেন যখন লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তখন অপারেশনের অপেক্ষমাণ তালিকা ৩০০ ছাড়িয়েছে। তাহলে সিরিয়াল আসতে আসতে ব্রেন টিউমারের মুমূর্ষু রোগীর অবস্থা কী হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্বজনদের কপালে ভাঁজ। দেশের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ভর্তি মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১১ হাজার রোগী সেবা নেয়। ২ হাজার ৬০০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি থাকে ৪ হাজার রোগী।

সরেজমিন হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের ওয়ার্ড ছাপিয়ে বারান্দা, মেঝে, করিডর, র‌্যাম্প সব জায়গায় রোগী। জরুরি বিভাগের ভিতরে র‌্যাম্পে ঢালু জায়গাতে সারিসারি শুয়ে আছে রোগী। কেউ নারী, কেউ শিশু, কেউ বৃদ্ধ। পাশের লোহার গ্রিল কাজ করছে স্যালাইন স্ট্যান্ড হিসেবে। সেখানেই হাতে ক্যানুলা লাগিয়ে ইনজেকশন দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। আলো বাতাস পৌঁছায় না এই জায়গায়। ভ্যাপসা গরমে শ্বাস নেওয়াই কঠিন। বাড়ি থেকে ছোট ফ্যান নিয়ে এসেছেন রোগীর স্বজনরা। টাঙ্গাইলের সোবহান প্রামাণিক (৬০) কাঁধে টিউমার নিয়ে দেড় মাস ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। এরপর অপারেশন হয়েছেন। ব্যান্ডেজ চুইয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে কাঁথা ভিজে গেছে অনেকটা। এই রোগীর পাশ দিয়ে জুতা, স্যান্ডেল পায়ে হেঁটে যাচ্ছে মানুষ। পাশে ভাত খেয়ে কুলি করছে আরেক রোগীর স্বজন। ফলে বাড়ছে ইনফেকশনের ঝুঁকি। মাতুয়াইলে বাসার পাশের মাঠে ক্রিকেট খেলছিল সিয়াম (১২)। গায়ে বল লাগাকে কেন্দ্র করে সিয়ামের মাথায় ব্যাট দিয়ে আঘাত করে আরেকজন। সিয়ামের মা আমেনা বেগম বলেন, আঘাতে মাথায় রক্ত জমাট বেঁধে ফুলে যায়। ছেলেকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে আনলে মাথায় ছোট একটা অপারেশন করেন চিকিৎসকরা।

 চিকিৎসা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই কিন্তু হাসপাতাল থেকে মাত্র দুটা ইনজেকশন দিয়েছে। অপারেশনে এবং পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ইনজেকশন অন্যান্য সামগ্রী আমাদের কিনতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল হলেও ওষুধ নিয়মিত কিনতে হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এই হাসপাতালে রোগী এলে কখনো ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। কারণ শেষ ভরসার জায়গা হিসেবে রোগীরা এখানে আসে। রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ৭০০ চিকিৎসক, রেসিডেন্ট, ইন্টার্ন, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা রয়েছেন। কিন্তু অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংকট থাকায় ৪৭টি অপারেশন থিয়েটার দুই শিফটে চালু করা যাচ্ছে না। মাত্র ৫৫ জন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট রয়েছে হাসপাতালে। এজন্য রোগীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অপারেশন করা হয় তবুও অনেক সময় এক থেকে দেড় মাস অপেক্ষা করতে হয়।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দালালের দৌরাত্ম্য আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সবাইকে আইসিইউ বা সব ধরনের পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব না হলে দালাল চক্র পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন। হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েই দালালরা রোগীদের বাইরে নিয়ে যায়। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আনসার ও আমাদের নিজস্ব স্টাফদের মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। নিয়মিত বিশেষ অভিযানও চালানো হচ্ছে।’

আশপাশের ক্লিনিকে রমরমা বাণিজ্য : চানখাঁরপুল, বকশী বাজারসহ ঢামেক হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে নামসর্বস্ব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ঢামেক থেকে রোগী ভাগিয়ে চলছে রমরমা ব্যবসা। হাসপাতালের বাইরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর রোগী ভাগাতে দালাল চক্রের এই অপতৎপরতায় প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা হাতবদল হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দালাল চক্র নির্মূলে সম্প্রতি অভিযান চালিয়েছে যৌথ বাহিনী। এ সময় নারী-পুরুষসহ দালাল ও চাঁদাবাজ চক্রের ২১ সদস্যকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বেশ কয়েকজনকে সর্বোচ্চ তিন মাসের জেল ও ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এদের অনেকেই জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কাজে নেমে পড়েছেন। এর আগে আরেক বিশেষ অভিযানে ঢামেক হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রায় ৭০ জন দালালকে আটক করা হয়। দালাল সিন্ডিকেটে রয়েছেন- সাইদুর, শিশির, কাউসার, নজরুল, সাগর, জয়দেব, মাহমুদা, মুনতাহার, মমতাজ, শেফালী, মোরশেদা, শাহিনুর, শাহনাজ, মর্জিনা, সাইফুল ও রাজীব। রোগী ভাগানোর দালালি করতে গিয়ে এরা প্রত্যেকেই একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন।

ঢামেক হাসপাতালে আসা যেসব রোগীর এনআইসিইউ বা আইসিইউ প্রয়োজন হয়, সেসব রোগীকে লক্ষ্য করেই পাঁচটি চক্র কাজ করে বলে জানা গেছে। এরা হাসপাতাল এলাকায় হোন্ডা বাহিনী নামে পরিচিত এবং হাসপাতালের একাডেমিক গেট ও বাগান এলাকাতেই এরা সাধারণত মোটরসাইকেল নিয়ে অবস্থান করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢামেক থেকে বেসরকারি হাসপাতালে কোনো রোগী ভর্তি করাতে পারলে চক্রের সদস্যদের রোগীপ্রতি পার্সেন্টেজ দেওয়া হয়। রোগীর চিকিৎসা বিলের ওপর নির্ভর করে পার্সেন্টেজের পরিমাণ। এই পার্সেন্টেজ সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। রোগী যত দিন ভর্তি থাকবেন, সে হিসাবেও টাকা নেওয়ার সুযোগ আছে। সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশের মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে হাসপাতাল পরিদর্শন করে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে কাজ শুরু করেছি। সংকট রয়েছে, সেগুলো নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক সংকট কাটাতে আগামী সপ্তাহেই ছুটিতে ও লিয়েনে ছিলেন এরকম এক হাজার চিকিৎসক যোগদান করবেন।’