Image description
ইকোনমিস্টের রিপোর্ট

ইরান যুদ্ধের কারণে বহু অভিবাসী মধ্যপ্রাচ্য ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে আছেন বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত সহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী শ্রমিক। তারা দেশে ফিরে আসায় প্রবাসী আয়ের ওপর বড় প্রভাব পড়ছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি সংকট। অনলাইন দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, অনেক তরুণ নেপালির মতোই পুষ্প কুমার চৌধুরী ভেবেছিলেন, উন্নতির পথটি উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকেই। তিন মাস আগে ২৭ বছর বয়সী এই তরুণ সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি রেস্টুরেন্টে শেফ হিসেবে চাকরি পান। এতে তিনি ওই অঞ্চলে কর্মরত প্রায় ১৭ লাখ নেপালির একজন হয়ে ওঠেন। কিন্তু এরপরই ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হয়। ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিহতদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ছিলেন অভিবাসী শ্রমিক। তার মধ্যে বাংলাদেশি, ভারতীয়, নেপালি ও পাকিস্তানিরাও রয়েছেন। পুষ্প কুমার চৌধুরী আহত হননি। তবে তার রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাজার হাজার অভিবাসীর মতো তাকেও ওই দেশ ছাড়তে হয়েছে।

২০২৪ সালে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ২ কোটিরও বেশি মানুষ গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) অন্তর্ভুক্ত ছয়টি দেশে কর্মরত ছিলেন। যা ২০১০ সালের তুলনায় ৬৫ ভাগ বেশি। এর মধ্যে প্রোগ্রামার ও ব্যবসায়ী থাকলেও অধিকাংশই রাঁধুনি, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহকর্মী বা অন্যান্য পেশায় যুক্ত। সংঘাতের কারণে তাদের অনেকের দেশে ফিরে আসা এই শ্রমিক পাঠানো দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ধনী প্রবাসীরা যেখানে স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েন, সেখানে অধিকাংশ শ্রমিক বাধ্য হচ্ছেন ফিরতে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নেয়া বন্ধ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত বছরের মার্চে যেখানে ৯২,৪৬০ জন বাংলাদেশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন, এ বছরের মার্চে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩১,২৭৯ জনে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে নেপালও নতুন শ্রম অনুমতি দেয়া কমিয়ে দিয়েছে।

বিদেশে কর্মরত মানুষের সংখ্যা কমে গেলে দেশে আর্থিক চাপ বাড়বে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় পেয়েছে, যা জিডিপি’র প্রায় ৬.৫ ভাগ। এটি বিদেশি সাহায্য বা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের চেয়েও বেশি। নেপালে প্রবাসী আয় দেশের জিডিপি’র এক-চতুর্থাংশ। এমনকি ভারতের মতো বড় দেশেও এটি জিডিপি’র প্রায় ৩.৫ ভাগ।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকস-এর মতে, উপসাগরীয় দেশের জিডিপি ১-২ ভাগ কমলে সাধারণত প্রবাসী আয় প্রায় ৫ ভাগ কমে যায়। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে যে এ বছর জিসিসি অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংকোচনের ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে, যারা ইতিমধ্যেই যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটে ভুগছে। সাইমুম ইসলাম একজন বাংলাদেশি। তিনি একটি মাছ ধরা কোম্পানির চাকরি হারিয়ে সৌদি আরব ছেড়ে এসেছেন। তিনি বলেন, আমি বিয়ে করেছি। বাড়িতে ছয়জন আমার আয়ের ওপর নির্ভর করতো। এখন সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আয়ের পতনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। প্রবাসী আয় অনেক সময় শিক্ষায় ব্যয় হয়, যা পরে শ্রমিকদের কম উৎপাদনশীল কৃষিখাত থেকে বের করে উচ্চ আয়ের কাজে যেতে সাহায্য করে। এ কথা বলছে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান দিয়েগোর এক গবেষণা।

এই অবস্থায় সাইমুম ইসলাম বা পুষ্প কুমার চৌধুরীর মতো মানুষের একমাত্র আশা দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া, যাতে তারা আবার বিদেশে কাজ ফিরে পেতে পারেন। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের চাহিদা উল্টোভাবে অভিবাসী শ্রমিকের চাহিদা বাড়াতে পারে, এমনকি ইরানেও।

কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশকে শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে পূর্বদিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভাব্য গন্তব্য হতে পারে। এছাড়া মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডও বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে নতুন শ্রম গন্তব্য তৈরি করা সহজ নয়। গালফ অঞ্চলের মতো প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক, দালাল ও রিক্রুটিং চেইন এসব দেশে এখনও তৈরি হয়নি। তাছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া জনসংখ্যা কমলেও বিদেশি শ্রমিক নিতে এখনও অনিচ্ছুক।

নেপালের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির প্রধান মহেশ কুমার বাসনেট বলেন, গালফে কাজের পরিবেশ প্রায়ই কঠিন এবং মানবাধিকারও অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। তবুও এখন বহু নেপালি জাপানি ও কোরিয়ান ভাষা শিখছে ভালো বেতন ও উন্নত কাজের আশায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও সম্ভাব্য গন্তব্য, বিশেষ করে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। সম্প্রতি মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বাজার পুনরায় খুলে দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন হলো- ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ কি এশিয়ার শ্রমিকদের পুরনো পথ বন্ধ করে নতুন পথ তৈরি করতে বাধ্য করবে?