Image description

লাগবে কতোটুকু আপনার? যতটুকু চান দেয়া যাবে, প্যারা নাই। অকটেন ৪৫০ টাকা। অনলাইনে ফেসবুক মার্কেট প্লেসে অকটেন বিক্রির সেল পোস্টে মেসেজ দিতে এমনি সাড়া দেন এক ব্যক্তি। পরিচয় গোপন করে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- বন্ধুরা মিলে বাইক ট্যুরে যাবো তাই অনেক তেল লাগবে। ১০টি বাইকে ১২ লিটার করে দিতে পারবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজকে ২০ দিতে পারবো। কালকে ৩০ দিব আর পরশুও একই পরিমাণ ম্যানেজ করে দিতে পারবো। অনলাইন মার্কেট প্লেসে গিয়ে ‘ফ্রেশ অকটেন’ নামের এই একটি গ্রুপে তেল কালোবাজারির এই গ্রুপটির সন্ধান পাওয়া যায়। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তেল সংগ্রহের জন্য একটি মোবাইল নম্বরও দিয়েছেন। ঢাকাসহ সারা দেশে জ্বালানি তেলের হাহাকারের মধ্যে তীব্র রৌদ্র-গরমে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ তেল পাচ্ছে না। অথচ অনলাইনে তেল কালোবাজারি চক্রের সদস্যরা বিজ্ঞাপন দিয়ে অনলাইনে তেল বিক্রি করছে। আর সেটাও বাজার মূল্যের চেয়ে তিনগুণ দামে। গত দুইদিনে এ রকম একাধিক চক্রের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করা হয়। তাদের সঙ্গে কথা বলে এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল তাদের কাছে মজুত থাকে। এছাড়া চাহিদা দিলে তারা সেটি ম্যানেজও করে দিতে পারে। সূত্রগুলো বলছে, জ্বালানি তেল পেতে যখন ক্রেতারা চব্বিশ ঘণ্টা ঘাম ঝরাচ্ছে, তখন অনলাইনকেন্দ্রিক মৌসুমি চক্রগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। ফেক আইডি খুলে, অনেকে পেজ তৈরি এবং ফেসবুকের মার্কেটপ্লেসে সেল পোস্ট দিয়ে অকটেন বিক্রি করে।

‘নূর অকটেন’ নামের আরেকটি গ্রুপে জানতে চাওয়া হয়- কত করে দিতে পারবেন লাস্ট? সত্যি পারবেন নাকি শুধু শুধু বলতেছেন? জবাবে ওই ব্যক্তি জানান, ৪০০ করে দিতে পারবো। কখন নিতে আসবেন আর শুধু শুধু আপনার সঙ্গে টেক্স করে টাইম নষ্ট করবো কেন। ফেক হলে আপনাকে বলতাম এডভান্সড করতে, ব্লা .. ব্লা..। লোকেশনে এসে ফেস টু ফেস নিতে বলতাম না। কখন নিবেন, বাইকে নিবেন নাকি বোতলে নিবেন ওইটা জানান। অকটেন এভেইলএবল নামের আরেকটি পোস্ট দিয়ে বলা হয়েছে- অকটেন ৩৫০ টাকা। এভেইলএবল আছে। লোকেশনে এসে নিতে হবে। দাম ফিক্সড। ১৪-১৬ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আনা। দয়া করে দামাদামি করবেন না। ‘অকটেন সাকিব’ নামের একটি ফেসবুক আইডিতে দেখা যায়- আইডিটিতে ২৮২ জন ফলোয়ার। ৩৫০ করে অকটেন বিক্রির পোস্ট দেয়া হয়েছে। মেসেঞ্জারে নক দিয়ে কতটুকু দিতে পারবে জানতে চাইলে জানানো হয় প্রতিদিন ১০ লিটার করে দিতে পারবে। সর্বোচ্চ ২০ লিটারও। এর বেশি পারবে না। কারণ অন্যদিকেও রেগুলার দিতে হয়। ‘এসপি ফুয়েল স্টেশন অকটেন’ নামের আরেকটি পোস্টে ২৫০ টাকা করে অকটেন বিক্রির পোস্ট দেয়া হয়েছে। আরেকটি পোস্টে বলা হয়েছে অকটেন ৫ লিটার ২২৫০ টাকা। লোকেশন মিরপুর। আরেকটি পোস্টে দেখা যায়, বিক্রেতা লিখেছেন দামের ২০ শতাংশ অগ্রিম দিতে হবে।

শুধু যে অনলাইনে পোস্ট দিয়ে বিভিন্ন চক্র তেল বিক্রি করছে- এমন না। তাদের এসব পোস্টে ব্যাপক সাড়াও দিচ্ছেন ক্রেতারা। দর কষাকষি করে অনেকেই তাদের কাছ থেকে তেল কিনছেন। এছাড়া অনেকে তেল কেনার জন্যও বিভিন্ন গ্রুপে পোস্ট দিচ্ছেন। রুহান জয় নামের এক ব্যক্তি একটি গ্রুপে পোস্টে লিখেছেন ১৫০ করে যদি অকটেন বিক্রি করতে চান তবে ইনবক্সে নক দিন। অফিসের জন্য সিরিয়ালে দাঁড়াইতে পারি না। ৪/৫ লিটার নিব। নাহিদ হাসান নামের আরেকজন পোস্টে লিখেছেন উত্তরা এলাকায় কেউ অকটেন বিক্রি করতেছেন? আমার লাগবে। সাজ্জাদ নামের আরেক ব্যক্তি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, এলাকায় কেউ যদি থাকেন অকটেন সেল করেন তাহলে ইনবক্স করুন। ইমার্জেন্সি লাগবে। ছদ্মনামের আরেকটি আইডি থেকে একজন কমেন্ট করেছেন ২৫০ করে লিটার, মিনিয়াম ১০ লিটার নিতে হবে। অকটেন কিনতে চাই শিরোনামে আরেক ব্যক্তি পোস্টে লিখেছেন, আমার ১৫০ লিটার অকটেন দরকার। হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা থাকলে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে নিব, অথবা লোকেশনে গিয়ে আনার সুযোগ থাকলে সরাসরি গিয়ে আনবো। যদি দিতে পারেন তবে ইনবক্সে জানান। আরেকজন পোস্টে লিখেছেন- ১০ লিটার অকটেন সেল করবো পাম্পের। জরুরি টাকার দরকার।

দেশজুড়ে যখন একটু জ্বালানি তেল পাওয়ার যুদ্ধে রাতদিন পরিশ্রম করছেন ক্রেতারা, তখন কালোবাজারি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল বিক্রি করা হলেও কয়েক ঘণ্টার ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এসব চক্র পাম্পের অসাধু কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে তেলের মজুত করছে। পাশাপাশি চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়েও তেল সংগ্রহ করে সেগুলো মজুত করে। চক্রের সদস্যরা লাইনে দাঁড়িয়ে দিন-রাতে একাধিকবার তেল সংগ্রহ করে। পাম্প থেকে ন্যায্যমূল্যে তেল কিনে বিক্রি করছে তিনগুণ দামে। অনলাইনে প্রকাশ্য পোস্ট দিয়ে তেল কেনাবেচা করলেও এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো নজর নাই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনও বিষয়টি নিয়ে তারা তেমন কিছু জানেন না। আবার কারও কারও নজরে এসব পোস্ট এবং অনলাইনে তেল বিক্রির বিষয়টি সামনে আসেনি। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসব বিষয়ে অন্ধকারে থাকলেও জ্বালানি তেলের কালোবাজারিরা অনেকটা প্রকাশ্যই এসব কারবার করছে।

মিরপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আনোয়ার হোসেন। খিলগাঁওয়ের বাসা থেকে সকাল ৭ টায় ঘুম থেকে উঠে ৮টায় অফিসের উদ্দেশ্য রওয়ানা হন। সকাল নয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অফিস করে বাসায় আসতে রাত আটটা বাজে। তিনি যাতায়াত করেন মোটরসাইকেলে। কিন্তু ১০ ঘণ্টা অফিসে কাজ করে পরে তার আর দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কেনার মতো মনোবল থাকে না। তাই তিনি অফিসে বসে মার্কেট প্লেসে তেল বিক্রির একটি পোস্ট দেখতে পান। ওই পোস্ট দাতার সঙ্গে কথা বলে তার দেয়া মিরপুর এলাকার একটি ঠিকানায় গিয়ে ২৫০ টাকা করে ১০ লিটার অকটেন নেন। আবার উল্টোচিত্রও দেখা গেছে। রাজধানীর ট্রাস্ট পাম্পে সোমবার রাত ১১টার দিকে লাইনে দাঁড়ান সোয়েব হোসেন নামের এক চাকরিজীবী। তেল সংগ্রহের জন্য তিনি অফিস থেকে ছুটিও নেন। রাত পেরিয়ে ভোররাত, তারপর সকাল পেরিয়ে দুপুর একটায় তার ভাগ্যে তেল জুটে। কমবেশি ১৪ ঘণ্টা তাকে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। আর এটি শুধু সোয়েবের বেলায় নয়। প্রতিদিন ঢাকার বিভিন্ন পাম্পে এ রকম হাজার হাজার মানুষ মোটরসাইকেল, গাড়ি নিয়ে তেল কিনতে যান। তীব্র গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেকেই ক্লান্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
র‌্যাব’র মুখপাত্র উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, বিষয়টি একেবারেই নতুন। আমরা জানার সঙ্গে সঙ্গে এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। যদি সত্যতা পাওয়া যায় তবে আমরা এসব চক্রকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।