জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শুরু থেকেই একের পর এক উদ্যোগ নেয় সরকার। ভোগান্তি কমাতে রেশনিং পদ্ধতিতে তেল বিক্রি, ফুয়েল কার্ড তৈরি, কর্মঘণ্টা কমানো, ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, সরবরাহ বাড়ানো হয়। জ্বালানিতে কোটি কোটি টাকা দেয়া হয় ভর্তুকি। কিন্তু তাতেও আসেনি সমাধান। সবশেষে বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। এতে উল্টো অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির রেশ পড়ে জনজীবনে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন সংকট রয়েছে ব্যবস্থাপনায়ও।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে মার্চের প্রথম সপ্তাহে তেলের সংকট শুরু হয়। গত ৫ই মার্চ প্রথমবার রাজধানীর একাধিক পাম্প তেলের সংকট দেখিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়। দীর্ঘমেয়াদে যাতে দেশে জ্বালানির সংকট না হয়, সেজন্য গত ৮ই মার্চ থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি শুরু হয়। রমজান ও ঈদযাত্রায় রেশনিং পদ্ধতির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি ঠেকাতে ও সেচের ডিজেলের চাহিদা পূরণে জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা তুলে নেয় সরকার। ১১ই মার্চ থেকে বিভাগীয় শহরের ফিলিং স্টেশনে ১০ শতাংশ সরবরাহ বাড়ানো হয়।
সরকারি অফিস ও মার্কেট বন্ধে নির্দেশনা
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অফিসের সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত করা হয়েছে। বর্তমানে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অফিস চলে। আর ব্যাংকে লেনদেন চলবে সকাল ৯টা থেকে ৩টা পর্যন্ত এবং ব্যাংক বন্ধ হবে বিকাল ৪টার মধ্যে। ২রা এপ্রিল রাতে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যা ৩রা এপ্রিল থেকেই কার্যকর করা হয়। এদিকে দেশের প্রধান প্রধান তেল ডিপোতে সেনাবাহিনী ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে (পাম্প) পুলিশ মোতায়েনের অনুরোধ করে বিপিসি। সে অনুযায়ী তেলের ডিপোতে সেনাবাহিনী ও পাম্পগুলোতে পুলিশ সদস্যরা টহল দিচ্ছেন। পাম্পগুলোতে পুলিশদের উপস্থিতি এখনো দেখা যায়।
ট্যাগ অফিসার নিয়োগ
জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়ে সব পেট্রোল পাম্পের জন্য একজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিভিন্ন পাম্পে অফিসারদের নিয়োগও দেয় সরকার। অফিসাররা সকাল ও বিকাল বেলা এসে পাম্প পরিদর্শন করেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেয় বিপিসি; অন্যান্য জেলা ও বিভাগীয় শহরে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা তাদের অধিক্ষেত্রাধীন প্রতিটি পেট্রোল পাম্পের জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে নিয়োগ করেন। ট্যাগ অফিসাররা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বা বিপিসি নির্ধারিত পদ্ধতিতে কাজ করবেন ও দৈনিক প্রতিবেদন দিয়ে থাকেন।
ফুয়েল কার্ড
তেলের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে এবং কালোবাজারি রুখতে ডিজিটাল ফুয়েল কার্ড বা ফ্লিট কার্ড চালু করে সরকার। ফুয়েল কার্ড মূলত একটি বিশেষ পেমেন্ট কার্ড, যা পেট্রোল, ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি কেনার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মতো কাজ করলেও এর মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ নির্ধারণ, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়া যায়। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এই কার্ড নিয়ে কাজ করে সরকার।
এদিকে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর নির্ধারিত দুটি ফিলিং স্টেশনে চালু করা হয়েছিল এই কার্যক্রম। শুরু থেকেই নানা ত্রুটিতে জর্জরিত হয়ে পড়ে এই সিস্টেম। এরপরও প্রথমে দুইটি পাম্প, পরে ৭টি সর্বশেষ ঢাকার ১৮টি পাম্পে ফুয়েল পাস উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেয় সরকার। সবশেষ সোমবার দুপুরে ঢাকার বাইরে আরও বেশ কয়েকটি জেলায় ফুয়েল পাস উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেয়া হয়। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ফুয়েল পাস সিস্টেমে প্রতিটি নিবন্ধিত যানবাহনের জন্য তৈরি হবে একটি আলাদা কিউআর কোড থাকবে। ফিলিং স্টেশনে তেল নেয়ার সময় পাম্পকর্মী সেই কোড স্ক্যান করবেন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ হবে কে, কখন, কতোটুকু তেল নিচ্ছেন। এতে নির্ধারিত সীমার বেশি তেল নেয়া যাবে না।
ভর্তুকি দিয়েও ঠেকানো যায়নি সংকট
চলমান সংকটে জ্বালানি তেলের পেছনে প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে বলে জানায় সরকার। এরপরও সংকট রীতিমতো বেড়েই চলেছে।
বাধ্য হয়ে বাড়ানো হয়েছে দাম
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অস্থিরতার মধ্যেই দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত শনিবার রাতে সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের নতুন দাম ঘোষণা দিয়েছে; যা রোববার থেকেই কার্যকর হয়েছে। রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বাধ্য হয়েই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এখনো ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের যে হারে দাম বেড়েছে সে তুলনায় অনেক কম বাড়ানো হয়েছে। নতুন দামেও ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। দাম বাড়লে তেলের পাম্পে লাইন কমবে বলে আশা করা হলেও পাম্পগুলোতে আগের মতোই দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।
পাম্পের সামনে একই চিত্র
ঢাকাসহ দেশের তেলের পাম্পগুলোতে গত দেড় মাস ধরেই দীর্ঘ লাইন আর স্থবিরতা দেখা গেছে। দেড় মাসে নিয়মিত সরজমিন ঢাকার বেশ কয়েকটি তেলের পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও কোনো উদ্যোগই কাজে আসেনি। প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হয়েছে তেলের লাইন। সর্বশেষ গত রোববার ঢাকার মতিঝিল রহমান ফিলিং স্টেশন, মেঘনা ফিলিং স্টেশন, করিম এন্ড সন্স ফিলিং স্টেশন, রমনা ফিলিং স্টেশন, শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস, পূর্বাচল ট্রেডার্স ও তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, আগের মতোই পাম্পে তেল নিতে বাইকাররা লম্বা লাইন ধরে আছেন। কেউ কেউ রাতভর লাইনে থেকে সকালে বা দিনের বেলা তেল নিতে পারছেন। সকালে বা দিনের বেলা যারা লাইনে দাঁড়িয়েছেন তারাও তীব্র রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করছিলেন। পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগের মতোই রয়েছে ভোগান্তি। সামান্য দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েনি কোথাও। সরকারের নেয়া কোনো উদ্যোগ পাম্পের ভোগান্তি কমাতে পারেনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস ও বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল মানবজমিনকে বলেন, কথা ছিল যে, দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহটা বাড়বে। এটা সাতদিন কন্টিনিউ করলে আর কোনো ক্রেতাই থাকতো না। কিন্তু উনারা দাম বাড়ালেন, সরবরাহ কন্ট্রোল করে রাখলেন। তাতে হলো কী, আবার তেল স্টোর হয়ে যাচ্ছে। মূল্য বাড়িয়ে সরবরাহ ঠিক না রাখলে কিন্তু এটা হবে না। সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গেছেন। শঙ্কিত যে তেল কন্টিনিউ আসবে কি না। এজন্য উনারা উন্মুক্ত করতে পারছেন না। উন্মুক্ত না করলেই সমস্যাটা জট পাকায়। সরবরাহ যদি বাড়াতো এক সপ্তাহের বেশি লাগবে না।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মানবজমিনকে বলেন, সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী তেলের মজুত পর্যাপ্ত থাকলে বিতরণে সমস্যা আছে। এখন বিতরণ যদি সরকার অল্প অল্প করে তাহলে সংকট থাকবে। এবং সরকারের ভবিষ্যৎ জ্বালানি পাবে কি না এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা না আসা পর্যন্ত এই অবস্থায় চলতে হতে পারে।